ৱযুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান পরোক্ষ শান্তি আলোচনার মাঝেই মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। সোমবার দক্ষিণ ইরানে নতুন করে বিমান হামলা চালানোর কথা নিশ্চিত করেছে ওয়াশিংটন। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, মূলত ‘আত্মরক্ষা’ এবং ইরানি বাহিনীর হুমকির মুখ থেকে নিজেদের সেনাদের নিরাপদ রাখতেই এই হামলা চালানো হয়েছে।
সেন্টকমের মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স জানিয়েছেন, কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীর কাছে অবস্থিত ইরানের অন্যতম প্রধান নৌঘাঁটি ও বন্দর নগরী বন্দর আব্বাসের একটি অঞ্চলকে লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়। মূলত ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি এবং সমুদ্রসীমায় মাইন স্থাপনের চেষ্টায় লিপ্ত থাকা স্পিডবোটগুলোকে লক্ষ্য করে এই আক্রমণ চালানো হয়েছে। এর আগে বন্দর আব্বাসের স্থানীয় প্রশাসন ওই এলাকায় বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনার পর তদন্ত শুরু করার কথা জানিয়েছিল।
এই হামলার পরপরই মঙ্গলবার ইরানের পক্ষ থেকে পাল্টা জবাব দেওয়ার দাবি করা হয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) তাদের আকাশসীমায় অনুপ্রবেশকারী একটি মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত করেছে। এছাড়া তাদের আকাশসীমায় ঢুকে পড়া একটি মার্কিন ফাইটার জেট এবং আরেকটি ড্রোনকে লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়া হয়েছে।
তবে এই ঘটনাটি ঠিক কখন ঘটেছে, তা সুনির্দিষ্টভাবে জানানো হয়নি। আইআরজিসি আরও স্পষ্ট করেছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেকোনোভাবে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করলে তার বিরুদ্ধে পাল্টা আঘাত হানার “বৈধ ও নিশ্চিত” অধিকার ইরানের রয়েছে। গত ৮ এপ্রিল থেকে দুই পক্ষ একটি যুদ্ধবিরতি মেনে চললেও, হরমুজ প্রণালীতে ইরানের নৌ-চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং ইরানি বন্দরে মার্কিন নৌবাহিনীর অবরোধকে কেন্দ্র করে গত মে মাসের শুরুতেও দুই দেশের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছিল। তবে সে সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে যুদ্ধবিরতি এখনো কার্যকর রয়েছে।
এই নতুন সামরিক সংঘাতের ফলে দুই দেশের মধ্যে সম্ভাব্য শান্তি চুক্তি বাধাগ্রস্ত হবে কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে। তবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বর্তমানে ভারত সফরে থাকা অবস্থায় সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, এই হামলার পরও একটি চুক্তি হওয়া এখনো সম্ভব।
মঙ্গলবার কাতারের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যস্থতায় ইরানের শীর্ষ আলোচক ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যকার বৈঠকের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, প্রাথমিক দলিলের সুনির্দিষ্ট ভাষা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে অনেক আলোচনা ও তর্কবিতর্ক চলছে, তাই চূড়ান্ত রূপ পেতে আরও কয়েক দিন সময় লাগতে পারে।
রুবিও জোর দিয়ে বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একটি চুক্তি করতে আগ্রহী, তবে তিনি হয় একটি ভালো চুক্তি করবেন, নয়তো কোনো চুক্তিই করবেন না। হরমুজ প্রণালীর অবরোধ নিয়ে রুবিও কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, প্রণালীটি উন্মুক্ত রাখতেই হবে, তা যে কোনোভাবেই হোক। সেখানে ইরান যা করছে তা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং বিশ্বের জন্য অগ্রহণযোগ্য ও টেকসই নয়।
অন্যদিকে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনেই বার্ষিক হজ উপলক্ষে দেওয়া এক বার্তায় যুক্তরাষ্ট্রকে তীব্র হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। চলতি বছরের শুরুতে তাঁর বাবার মৃত্যুর পর সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তাঁকে আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি। অজ্ঞাত স্থান থেকে দেয়া এই বার্তায় খামেনেই বলেন, মধ্যপ্রাচ্য আর মার্কিন ঘাঁটির ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হবে না। এই অঞ্চলে তাদের অপকর্মের কোনো নিরাপদ আশ্রয় থাকবে না এবং আমেরিকা দিন দিন তার আগের অবস্থান থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
মার্কিন গোয়েন্দাদের ধারণা, যুদ্ধের প্রথম দিন ইসরায়েলি হামলায় আহত হওয়া মোজতবা খামেনেই বর্তমানে গোপন আস্তানায় থাকায় তাঁর দূতেরা সরাসরি যোগাযোগ করতে পারছেন না, যার ফলে ওয়াশিংটনের সাথে আলোচনার গতি ধীর হয়ে পড়েছে। এছাড়া ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানান, আলোচনার বড় অংশে সমঝোতা হলেও চুক্তি সই এখনই আসন্ন, এমন দাবি কেউ করতে পারে না।
যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যমগুলো জানাচ্ছে, এই আলোচনা থেকে এখনই কোনো স্থায়ী সমাধান আসবে না। ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, তাদের অবরুদ্ধ তহবিল অবমুক্ত করা এবং পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার মতো জটিল বিষয়গুলো পরবর্তীতে আলোচনা করা হবে।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর সময় ইরানের কাছে প্রায় ৪৪০ কেজি ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ছিল, যা পারমাণবিক বোমা তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ৯০ শতাংশ সমৃদ্ধকরণের খুব কাছাকাছি। সোমবার রাতে এই বিষয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, এই সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হয় অবিলম্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করতে হবে, অথবা ইরানের সাথে যৌথ সমন্বয়ের মাধ্যমে তাদের নিজেদের মাটিতেই তা ধ্বংস করে ফেলতে হবে।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল একযোগে ইরানে ব্যাপক বিমান হামলা চালালে পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে এই যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। এর জবাবে ইরান ইসরায়েল ও উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন মিত্র দেশগুলোতে পাল্টা হামলা চালায় এবং হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়, যার ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছিল। বর্তমানে দুই পক্ষ যে সমঝোতা স্মারক নিয়ে আলোচনা করছে, তার মূল লক্ষ্য হলো ৬০ দিনের জন্য যুদ্ধবিরতি বাড়ানো, হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে একটি টেকসই দীর্ঘমেয়াদী আলোচনার পথ তৈরি করা।
তথ্যসূত্র: বিবিসি
