মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক নাটকীয় মোড় নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ইরানের বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে সরাসরি হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে, ইসরাইলের সুরক্ষায় এবং তেহরানের প্রভাব খর্ব করতে আমিরাত কেবল মৌখিক বিরোধিতাই নয়, বরং সরাসরি সামরিক সংঘাতের পথে হেঁটেছে। যদিও একটি ক্ষুদ্র ও ভঙ্গুর অর্থনীতির দেশ হিসেবে ইরানের মতো শক্তির সঙ্গে বিবাদে জড়ানোকে অনেকে ‘অযৌক্তিক’ মনে করছেন, কিন্তু বিশ্লেষক রবার্ট ইনল্যাকেশের মতে, আমিরাতের এই পদক্ষেপ তাদের দীর্ঘমেয়াদী ‘জায়নবাদী’ প্রকল্পেরই অংশ।
বিশ্লেষণটিতে বলা হয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত নিজেকে উদ্ভাবন, শান্তি এবং সহনশীলতার দেশ হিসেবে বিশ্বদরবারে উপস্থাপন করলেও পর্দার আড়ালে তারা ভিন্ন এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে। আবুধাবির শাসকরা তাদের বিশাল তেল সম্পদ ব্যবহার করে আধুনিক ও প্রগতিশীল একটি ভাবমূর্তি তৈরি করেছেন, যা আসলে দুবাইয়ের কৃত্রিম স্কাইলাইনের মতোই ‘কৃত্রিম’।
অভিযোগ করা হয়েছে যে আমিরাত তাদের সামরিক ও গোয়েন্দা সক্ষমতাকে ব্যবহার করে এই অঞ্চলে ইসরাইলবিরোধী প্রতিরোধ আন্দোলনগুলোকে দমন করার চেষ্টা করছে। ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’ বা ইসরাইলের সঙ্গে স্বাভাবিকীকরণ চুক্তির পেছনে আমিরাত কেবল নিজেই যুক্ত হয়নি, বরং সুদান ও মরক্কোর মতো দেশগুলোকেও এই পথে টেনে এনেছে।
ইরান-ইসরাইল সংঘাতের ক্ষেত্রে আমিরাত দ্বিমুখী নীতি অবলম্বন করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। একদিকে তারা নিজেকে নিরপেক্ষ ও ভুক্তভোগী হিসেবে প্রকাশ করেছে, অন্যদিকে মার্কিন-ইসরাইলি জোটকে ইরানে হামলার জন্য নিজেদের ভূখণ্ড ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে। এমনকি ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা মোকাবিলায় আমিরাত তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে একীভূত করেছে।
ইরানের আকাশসীমা পর্যবেক্ষণে আমিরাতের মালিকানাধীন ‘উইং লুং ২’ ড্রোন ব্যবহার করে ইসরাইলকে তথ্য সরবরাহ করা হয়েছে বলেও তথ্য উঠে এসেছে।
আঞ্চলিক অস্থিরতায় আমিরাতের ভূমিকা নিয়ে বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, লিবিয়া, ইয়েমেন এবং সুদানের মতো দেশগুলোতে ছায়াযুদ্ধ বা প্রক্সি ওয়ারে আমিরাত সক্রিয়ভাবে জড়িত। সুদানের আরএসএফ বাহিনীকে সমর্থন দেওয়া থেকে শুরু করে ইয়েমেনে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মদত দেওয়া পর্যন্ত—সবক্ষেত্রেই আমিরাতের লক্ষ্য মূলত প্যান-ইসলামিক এবং প্যান-আরব ঐক্যকে বাধাগ্রস্ত করা। বিশেষ করে মুসলিম ব্রাদারহুড বা এমন কোনো গোষ্ঠী যারা ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করে, তাদের দমনে আমিরাত সব সময় সোচ্চার।
ওমান যেখানে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের জন্য নিজের ভূমি ব্যবহারে অস্বীকৃতি জানিয়েছে এবং কাতার নিরপেক্ষ অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করছে, সেখানে আমিরাত তেহরানকে ‘সন্ত্রাসবাদী’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে উত্তেজনা আরও উসকে দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আমিরাত নিজেকে ‘লিটল স্পার্টা’ বা আঞ্চলিক পরাশক্তি হিসেবে প্রমাণ করতে চাইলেও ইরানের মতো বড় শক্তির সঙ্গে সরাসরি সংঘাত তাদের নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ইসরাইলের সম্প্রসারণবাদী নীতিতে সরাসরি অংশীদার হওয়ার মাধ্যমে আমিরাত মধ্যপ্রাচ্যে এক নতুন ও জটিল সমীকরণ তৈরি করেছে।
