বরগুনার বহুল আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নির জীবন এখন সীমাবদ্ধ কনডেম সেলের চার দেয়ালের মধ্যে। বাইরের মানুষের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ নেই বললেই চলে। কারারক্ষীদের সঙ্গেও প্রয়োজন ছাড়া তেমন কথা বলেন না। তবে বাবা-মা ও স্বজনেরা দেখা করতে এলে তাদের সঙ্গেই কিছুটা সময় কথা বলেন।
কারা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, মিন্নির দিনের বড় একটি অংশ কাটে ইবাদত-বন্দেগিতে। তিনি নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন। অবসর সময়ে নীরবে নিজের মতো থাকেন। কারাগারে তার আচরণও সন্তোষজনক। এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের শৃঙ্খলাভঙ্গ বা অপ্রীতিকর ঘটনার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ পাওয়া যায়নি। সব সময় সাদা পোশাক পরিধান করেন তিনি। কারা কর্মকর্তাদের ভাষ্য, তাকে খুব একটা আবেগপ্রবণ বা অস্থির হতে দেখা যায় না।
শুক্রবার (২৬ জুন) রিফাত শরীফ হত্যা মামলার ৭ বছর পূর্ণ হয়েছে। মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মিন্নির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মামলা পরিচালনা এবং বাবা-মা ও স্বজনদের সাক্ষাতের সুবিধার্থে তাকে কাশিমপুর কারাগার থেকে বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থানান্তর করা হয়েছে বলে জানিয়েছে কারা কর্তৃপক্ষ।
আদালতের নথি অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ২৬ জুন বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে স্ত্রী মিন্নির উপস্থিতিতে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয় রিফাত শরীফকে। ওই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। পরে তদন্তে হত্যাকাণ্ডে মিন্নির সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে।
তদন্ত শেষে ২০১৯ সালের ১ অক্টোবর প্রাপ্তবয়স্ক ও অপ্রাপ্তবয়স্ক দুই ভাগে ২৪ জনকে অভিযুক্ত করে বরগুনার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে পুলিশ। এতে ১০ জন প্রাপ্তবয়স্ক এবং ১৪ জন অপ্রাপ্তবয়স্ককে আসামি করা হয়। এরপর ২০২০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর প্রাপ্তবয়স্ক ১০ আসামির মধ্যে নিহত রিফাতের স্ত্রী মিন্নিকে প্রধান পরিকল্পনাকারী হিসেবে উল্লেখ করে ছয় আসামিকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেয় আদালত। বাকি চারজনকে খালাস দেওয়া হয়।
তবে শুরু থেকেই মিন্নির পরিবার দাবি করে আসছে, তিনি নির্দোষ। তাদের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করতে মিন্নিকে মামলায় জড়ানো হয়েছে। তারা তদন্তে নানা অনিয়মের অভিযোগও তুলেছেন। তবে এসব অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়নি।
মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর গণমাধ্যমের কাছে বরাবরই একই অভিযোগ করেছেন। তিনি বলেন, ‘মিন্নি তার স্বামীকে হাজারো মানুষের সামনে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছে। কিন্তু সে ব্যর্থ হয়। শেষ পর্যন্ত সে খুনি হয়ে গেল শুধু শম্ভুদার কারণে। তিনি এমন একটি পরিকল্পনা এখানে করেন তার ছেলেকে বাঁচানোর জন্য। তার ছেলে হলো বরগুনার মাদক সম্রাট। সে মাদকের ডিলার এবং এই ‘নয়ন বন্ড’ থেকে শুরু করে বরগুনার যত মাদকাসক্ত মানুষ ও যুব সমাজ সবই তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল।’
একসময় দেশের সবচেয়ে আলোচিত হত্যাকাণ্ডগুলোর একটির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা মিন্নির বর্তমান জীবন অনেকটাই নীরব। কনডেম সেলের নির্জনতায় তার প্রতিদিনের সঙ্গী ইবাদত-বন্দেগি, সীমিত পরিসরের সাক্ষাৎ এবং আদালতের চূড়ান্ত রায়ের অপেক্ষা
