তিন মাস আগেই মেয়াদ ফুরিয়ে গেছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের বর্তমান কমিটির। মেয়াদ শেষ হওয়ার পর থেকেই নতুন কমিটির গুঞ্জন ছড়াচ্ছে নানাভাবে। সম্ভাব্য প্রার্থীরা দিন-রাত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন নতুন কমিটির শীর্ষ সারিতে জায়গা করে নিতে। কেউ আঞ্চলিক, কেউ ক্যাম্পাস, কেউবা রাজনৈতিক মন্ত্রী-এমপির বলয় ঘিরে তদবির করছেন।
তবে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, ছাত্রদলের নতুন কমিটির একটি খসড়া বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের টেবিলে রয়েছে। ছাত্রদলের সাংগঠনিক অভিভাবক হিসেবে তিনি বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদকসহ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বশীলদের সঙ্গে আলোচনা করে কমিটি চূড়ান্ত করবেন।
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার মেয়াদ ফুরিয়ে গেছে। ২০২৪ সালের মার্চের শুরুতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের বর্তমান কমিটি ঘোষিত হয়। রাকিবুল ইসলাম রাকিব সভাপতি এবং নাছির উদ্দীন নাছির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পান। যাদের মেয়াদ ছিল দুই বছর।
বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গ সংগঠনের একজন শীর্ষনেতা সময়ের আলোকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান আমাদের নিয়ে বসেছিলেন। তিনি সব অঙ্গ-সংগঠনের সবশেষ হালচাল জানার চেষ্টা করেছেন। সংগঠনকে কীভাবে আরও গতিশীল করা যায়, সে বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন। সরকারে থাকায় যাতে সংগঠন দুর্বল হয়ে না পড়ে সেদিকে সতর্ক থাকার কথা বলেছেন।
বিশেষ করে ছাত্রদলকে ক্যাম্পাস অঙ্গন শান্তিপূর্ণ রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ছাত্রদলের কমিটি দিয়েই অঙ্গ সংগঠনগুলোর নেতৃত্ব হালনাগাদ করতে চান তারেক রহমান। কমিটির একটি খসড়া ইতিমধ্যে তৈরিও করেছেন।
ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক ও সংসদের হুইপ রকিবুল ইসলাম বকুলের সঙ্গে আলোচনা করে চূড়ান্ত করবেন। তার মতামত, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি নিরপেক্ষ সংস্থার রিপোর্ট ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে কমিটি চূড়ান্ত করবেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
কারা পরবর্তী কমিটিতে আসতে পারেন- জানতে চাইলে ছাত্রদলের খোঁজখবর রাখেন বিএনপির এমন এক শীর্ষনেতা সময়ের আলোকে বলেন, এর পুরোটা আসলে প্রধানমন্ত্রীর সুচিন্তিত বিবেচনার ওপর নির্ভর করছে। তবে যতটা জানি ছাত্রদলের বর্তমান কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আমানউল্লাহ আমানকে প্রধানমন্ত্রী রাজনৈতিকভাবে পছন্দ করেন। তার বিষয়টি অবশ্যই সামনের দিকে থাকবে।
এখন সেশন ও বয়সের বেশ কিছু সমীকরণ আছে। কবে কমিটি হতে পারে, জবাবে তিনি বলেন, শিগগিরই। সেটি যেকোনো সময়ে, বাজেটের আগে বা পরে হতে পারে।
ছাত্রদলের একজন শীর্ষনেতা সময়ের আলোকে জানান, সম্প্রতি সংগঠনের শীর্ষ কয়েকজন নেতাকে প্রধানমন্ত্রী গুলশানে ডেকেছিলেন। সেখানে ছাত্রদলের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছিরের কাছে সরাসরি মতামত জানতে চান তারেক রহমান। পরবর্তী কমিটিতে তিনি থাকতে চান কি না সেই বিষয়টিও আলোচনায় উঠে আসে।
এক পর্যায়ে নাছির জানান, তিনি দ্বিতীয় মেয়াদে ছাত্রদলের নেতৃত্বে থাকতে চান না। তিনি মূল দল বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় হতে চান বলে অভিপ্রায় প্রকাশ করেন।
সূত্র জানায়, ছাত্রদলের কমিটি ঘিরে আগের মতো ভাই ভাই বলয় না থাকলেও সক্রিয় আছে বকুল-এ্যানী (শহিদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী)-নরসিংদী, বৃহত্তর নোয়াখালী, বৃহত্তর ময়মনসিংহ ও বরিশাল বলয়। ওইসব বলয়ের নেতারা ছাত্রদলের কমিটি ঘিরে বেশ তৎপর। তারা তাদের মাইম্যানকে শীর্ষে নিতে মরিয়া।
তবে বর্তমানে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ছাত্রলীগ নিষিদ্ধ হয়ে ক্যাম্পাস ছাড়া। সেই কারণে তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ হয়ে উঠেছে জামায়াতে ইসলামীর সংগঠন ছাত্রশিবির। সব বাস্তবতা সামনে রেখেই এবারের ছাত্রদলের কমিটি নির্ধারণ হবে।
সভাপতি পদে আলোচনায় যারা : বরাবরের মতো ছাত্রদলের কমিটিতে এবারও ডজনখানেক নেতা নেতৃত্বের দৌড়ে আলোচনায় রয়েছেন। সুপার ফাইভ অর্থাৎ বর্তমান শীর্ষ পাঁচ নেতার মধ্যে আলোচনায় আছেন সাংগঠনিক সম্পাদক আমানউল্লাহ আমান।
আর বাকিদের পরবর্তী কমিটির নেতৃত্বে থাকার সম্ভাবনা ক্ষীণ। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দীর্ঘদিন গুম ও কারাবন্দি থেকে পরিচিতি লাভ করেন আমানউল্লাহ। রাজপথে আন্দোলন ও জেলখানায় তার ওপর অমানুষিক নির্যাতনের অভিজ্ঞতা বিভিন্ন টকশোতে তুলে ধরে ব্যাপক আলোচনায় আসেন ছাত্রদলের এ নেতা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০৯-১০ সেশনের এ শিক্ষার্থী সভাপতি হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে আছেন। তার বাড়ি বরগুনা জেলায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একই সেশনের মধ্যে আলোচনায় আছেন ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ২০১৯ সালের নির্বাচনে ছাত্রদলের প্যানেল থেকে সহ-সভাপতি (ভিপি) পদপ্রার্থী ছিলেন তিনি। তার বাড়ি ময়মনসিংহ বিভাগের নেত্রকোনা জেলায়। জুলাই আন্দোলনের আগ মুহূর্তে ডিবি পরিচয়ে তুলে নেওয়া হয় মোস্তাফিজুর রহমানকে।
সময়ের আলোকে মোস্তাফিজুর বলেন, সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে। শিক্ষার্থীদের চাহিদা পূরণে আমাদের দলের শীর্ষ নেতৃত্ব বরাবরের মতোই মেধাবী, অভিজ্ঞ, ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদের দিয়ে সংগঠন পুনর্গঠন করবেন। একই ব্যাচের শিক্ষার্থী ও বর্তমান কমিটির এক নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মমিনুল ইসলাম জিসানও আছেন আলোচনায়। তার বাড়ি নরসিংদী জেলায়।
এ ছাড়া বর্তমান কমিটির সহ-সভাপতি আরিফুল ইসলাম আরিফ ও এইচএম আবু জাফরও ভিন্ন বলয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। আরিফের বাড়ি টাঙ্গাইল ও জাফরের বাড়ি বরিশাল।
২০০৮-০৯ সেশন থেকে সভাপতি পদে এগিয়ে রয়েছেন বর্তমান কমিটির সহ-সভাপতি এজাজুল কবির রুয়েল। তার বাড়ি ময়মনসিংহে। এ ছাড়া বরিশালে মঞ্জুরুল আলম রিয়াদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি খোরশেদ আলম সোহেলও আছেন আলোচনায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে বেশ আলোচিত মুখ ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ডা. তৌহিদুর রহমান আউয়াল ও কাজী জিয়া উদ্দিন বাসিত। ডা. আউয়াল রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেলের ও বাসিত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। আউয়াল ঢাকার হলেও বাসিতের বাড়ি লক্ষ্মীপুরে।
উভয়ই সময়ের আলোকে বলেন, ছাত্রদল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যেই হতে হবে, বিষয়টি এমন শিরোধার্য নয়। আমরাও বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে প্রমাণ করেছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে থেকেও অগ্রণী ভূমিকা রাখা যায়।
সাধারণ সম্পাদক পদে সম্ভাব্যরা : ২০১০-১১ সেশন থেকে সাধারণ সম্পাদক হতে পারেন ছাত্রদলের বর্তমান যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইব্রাহিম খলিল। তার বাড়িও লক্ষ্মীপুরে।
সময়ের আলোকে তিনি বলেন, নেতৃত্ব পেলে আমি চাই ছাত্রদলকে একটি আধুনিক, শিক্ষা-গবেষণামুখী, দক্ষ নেতৃত্বনির্ভর ও শিক্ষার্থীবান্ধব সংগঠন হিসেবে গড়ে তুলতে, যা গণঅভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নের পাশাপাশি বিএনপি এবং তারেক রহমান ঘোষিত রাষ্ট্র মেরামতের কর্মসূচিকে শক্তিশালী ভিত্তি দেবে।
আরেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক গাজীপুরের মাছুম বিল্লাহও এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার দৌড়ে এগিয়ে আছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যার এ এফ রহমান হল ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি। আলোচিত জুলাই আন্দোলনে গুমসহ মোট ৪ বার রাজনৈতিক মামলায় ১৯২ দিন কারাবন্দি ছিলেন মাছুম বিল্লাহ।
এ ছাড়া একই সেশনের মধ্যে ঢাবি ছাত্রদলের সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহসও বেশ আলোচনায়। ২০১১-১২ সেশন থেকে সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় রয়েছেন ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রাজু আহমেদ, ঢাবি ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন। এ দুজনের বাড়ি খুলনা বিভাগে।
ছাত্রদলের নতুন কমিটি গঠন প্রসঙ্গে বর্তমান সাধারণ সম্পাদক নাছির সময়ের আলোকে বলেন, আমাদের দুই বছরের কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে। আমাদের সাংগঠনিক অভিভাবক প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যখন চাইবেন তখনই নতুন কমিটি হবে। তিনি ডাকবেন আমাদের। তিনি মতামত চাইলে আমরা তা তুলে ধরব। সাংগঠনিক অভিভাবক ছাত্রদলের সব বিষয়ে ওয়াকিবহাল আছেন।
