ঝালকাঠিতে জিততে না পারলেও ভোটে জামায়াতের অভাবনীয় উত্থান

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঝালকাঠি-১ ও ২ সংসদীয় আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা বিজয়ী না হলেও তাদের প্রাপ্ত বিপুল ভোট স্থানীয় ও জাতীয় রাজনীতিতে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। দুটি আসনেই তারা বিএনপি প্রার্থীর কাছে কম ব্যবধানে হারলেও এ জেলায় দলটির দাঁড়িপাল্লার প্রতীকের পক্ষে ভোট বিস্ময়করভাবে বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয় জনমনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

জেলা জামায়াত সূত্রে জানা যায়, জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে যখন জামায়াতের প্রার্থী ঘোষণা করা হয়, তখন দলটির অভ্যন্তরীণ জরিপে ঝালকাঠি জেলার এ দুটি আসন ছিল সি গ্রেডে। কিন্তু প্রার্থীরা গণসংযোগ ও প্রচার শুরু করার পর পরিস্থিতি ধীরে ধীরে পাল্টাতে শুরু করে।

বিশেষ করে ঝালকাঠি-১ আসনে জামায়াত প্রার্থী পরিবর্তন করে ড. ফয়জুল হককে মনোনয়ন দেওয়ায় খুব দ্রুতই দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের পক্ষে জনসমর্থন বাড়তে থাকে। নির্বাচনের আগে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে চলে আসেন ফয়জুল হক। ধানের শীষের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই আসন ধরে রাখতে সর্বশক্তি নিয়োগ করে বিএনপি। তার পরও মাত্র ৬ হাজার ৮৯০ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন তিনি। ধানের শীষ প্রতীকের বিজয়ী প্রার্থী রফিকুল ইসলাম জামাল পান ৬২ হাজার ১০ ভোট, আর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের ফয়জুল হক পান ৫৫ হাজার ১২০ ভোট।

এদিকে ঝালকাঠি-১ আসনের জামায়াতের ভোটের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৯৯১ সালে পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে জামায়াত প্রার্থী মাওলানা মোজাম্মেল হোসাইন পান ১ হাজার ৮৬০ ভোট । পরবর্তী সময়ে ১৯৯৬ সালের সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনি ৯২৫ ভোট পান। সেখান থেকে ২০২৬ সালে এসে জামায়াতের ভোটের হার জ্যামিতিক প্রগতিতে বেড়ে দাঁড়ায় ৫৫ হাজারে।

অন্যদিকে ঝালকাঠি-২ আসনে ১৯৯১ সালে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থী অ্যাডভোকেট হায়দার হোসেন সাড়ে ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার ভোট এবং ১৯৯৬ সালের সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও প্রায় সমসংখ্যক ভোট পান তিনি। সেখান থেকে ২০২৬-এ এসে জামায়াতের প্রার্থী শেখ নেয়ামুল করিম ৭০ হাজার ৫৫৬ ভোট পান।

যদিও বিজয়ী বিএনপি প্রার্থী ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টোর সঙ্গে তার ভোটের ব্যবধান ছিল প্রায় ৪৪ হাজার। কিন্তু ঝালকাঠি পৌরসভায় বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের ভোটের ব্যবধান মাত্র ১ হাজার ৪৪২ ভোট। এখানে বিএনপি ভোট পেয়েছে ১১ হাজার ৪৯৬টি, পাশাপাশি জামায়াত পেয়েছে ১০ হাজার ৫৪ ভোট। এছাড়া শহরের বেশ কয়েকটি কেন্দ্রে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক প্রথম হয়েছে। রাজনৈতিক সচেতন মহলের ধারণা, আগামী পৌর নির্বাচনে এই ভোট ব্যাংক জামায়াতকে সুবিধাজনক অবস্থানে রাখবে।

ঝালকাঠি জেলা জামায়াতের সাংগঠনিক অবস্থান সম্পর্কে অনুসন্ধানে জানা যায়, বরাবরই এখানে সাংগঠনিকভাবে অবস্থান দুর্বল দলটির। জেলার ৩২টি ইউনিয়নের কোথাও এ পর্যন্ত তাদের কোনো জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হতে পারেনি। শুধু ঝালকাঠি পৌরসভায় একটি ওয়ার্ডে তাদের একজন কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছিল। তবে বর্তমানে জামায়াতের প্রতিটি ইউনিয়নে কমিটি রয়েছে।

জানা যায়, এবারের নির্বাচনে সব কেন্দ্রেই তারা এজেন্ট দিতে পেরেছে। তবে বেশ কিছু কেন্দ্র থেকে দলটির এজেন্টদের বের করে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। দলের একটি যুব বিভাগ থাকলেও এই বিভাগটি নির্বাচনে তেমন কোনো পারফরমেন্স দেখাতে পারেনি। এছাড়া নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে যারা ছিলেন, তাদের সঙ্গে প্রার্থীদের ও গণমাধ্যমকর্মীদের সমন্বয়ের অভাব ছিল। তারা অনেক তথ্যই সময়মতো গণমাধ্যমকে অবহিত করতে পারেনি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে জামায়াতের একাধিক নেতাকর্মী আমার দেশকে বলেছেন, প্রার্থীরাও মাঠে নামতে দেরি করে ফেলেছেন, যার প্রভাবও ভোটের মাঠে পড়েছে। তবে এত সব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও ভোটের ফলাফলকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন জামায়াতের নেতাকর্মীরা।

জামায়াতের ভোট বাড়াসহ দুটি আসনে দলের পরাজয়ের মূল্যায়ন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জেলা জামায়াতের আমির অ্যাডভোকেট হাফিজুর রহমান আমার দেশকে বলেন, জাতীয়ভাবে জামায়াতের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি, আমাদের প্রার্থীদের ব্যাপারে কোনো ব্যক্তিগত অভিযোগ না থাকা, তৃণমূল পর্যন্ত সংগঠন বিস্তৃত হওয়ার কারণে আমাদের দুটি আসনের ভোট বেড়েছে।

নির্বাচনে আসন হারানো প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ঝালকাঠি-১ আসনে বিভিন্ন কেন্দ্রে আমাদের এজেন্ট বের করে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে দাঁড়িপাল্লায় ভোট না দেওয়ার হুমকির কারণে তাদের ভোট আমরা পাইনি। এসব কারণে জামায়াত প্রার্থীরা বিজয়ী হতে পারেননি।