অন্তর্বর্তী সরকারের অন্তত তিনজন উপদেষ্টা নির্বাচন বিলম্বিত করার নানামুখী খেলায় লিপ্ত ছিলেন । অন্য একজন উপদেষ্টা ছিলেন অবশ্য সুবিধাবাদী ভূমিকায়। দু’পক্ষকেই খুশি রেখে সময়টা কাটিয়েছেন। তিনি বরাবরই অস্থির। এই উপদেষ্টাদের কৌশলের অন্যতম হাতিয়ার ছিল মব সন্ত্রাস। তারা কৌশলের অংশ হিসেবে মব সন্ত্রাসকে উসকে দিতেন। শুরুতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে নির্বাচন দেয়ার ব্যাপারে প্রফেসর ইউনূস চিন্তাভাবনা করছিলেন। পরে তিনি একগাদা সংস্কার প্রস্তাব জাতির সামনে উপস্থাপন করেন। এগুলোর পেছনে ক্ষমতার মেয়াদ আরও বাড়ানোর ছক ছিল-এমনটাই বলা হচ্ছে। তিন উপদেষ্টার চাপের কারণে দ্রুত নির্বাচন থেকে পিছু হটেন ড. ইউনূস।
তাদের যুক্তি ছিল নির্বাচন এত তাড়াতাড়ি দেয়া ঠিক হবে না। পরিস্থিতি সামাল দেয়া সত্যিকার অর্থেই কঠিন হবে। এসব যুক্তির পেছনে তাদের বিশেষ মতলব ছিল। তারা চেয়েছিলেন ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে এবং কৌশলে তাদের পছন্দের শক্তির কাছে ক্ষমতা তুলে দিতে। এসব পরিকল্পনা ভেস্তে যায় জনচাপে এবং ভূ-রাজনৈতিক কারণে। এখানে আঞ্চলিক শক্তি ছিল ভীষণ তৎপর। তারা চেয়েছে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নির্বাচন আয়োজন করতে। এর পেছনে অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল প্রফেসর ইউনূসের নেতৃত্বের অবসান। উপদেষ্টারা প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণ করতেন। আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোকে কনভিন্স করার চেষ্টাও করতেন। নির্বাচন দ্রুত হলে কী কী সমস্যা হতে পারে। তাদের কথা-পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে না। কারণ আইনশৃঙ্খলার অবস্থা নাজুক। এই সুযোগে অন্যপক্ষ ক্ষমতা নিয়ে যেতে পারে। ভূলুণ্ঠিত হতে পারে আগস্টের চেতনা। একটি আন্তর্জাতিক শক্তিকে তারা অবশ্য এই যুক্তি দিয়ে কনভিন্স করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এর পেছনে আরও কিছু যুক্তি রয়েছে যা ছিল আত্মঘাতী এবং ক্ষমতা লিপ্সার কৌশল।
সন্ধ্যা হলেই তারা বৈঠকে বসতেন। আরও দু’একজন থাকতেন। যারা ক্ষমতায় না থেকেও ছড়ি ঘুরাতেন। এক পর্যায়ে তারা এতটাই শক্তিশালী হয়ে যান যাতে প্রফেসর ইউনূস অসহায় হয়ে পড়েন। তিনি বারবার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে থাকেন। একটি আঞ্চলিক শক্তির চাপ এবং নিজের অঙ্ক মেলাতেই তিনি নির্বাচনমুখী হতে বাধ্য হন। তার হিসাব-নিকাশ ছিল- যদি নির্বাচন ভন্ডুল হয়ে যায় তাহলে তার ব্যক্তিগত পুঁজিপাট্টা সবই যাবে। শূন্য হাতে বাড়ি ফিরবেন। লন্ডন বৈঠক ছিল নির্বাচনমুখী হওয়ারই একটি অংশ। যদিও এই উপদেষ্টারা বৈঠকের আগেই নানা ষড়যন্ত্রে যুক্ত হন। বলতে থাকেন, এই বৈঠক প্রফেসর ইউনূসের প্রশাসনকে দুর্বল করবে। মানুষের কাছে ভুল বার্তা যাবে। এমনকি বৈঠকের ফলাফলকেও বানচাল করতে ভীষণ তৎপর হয়ে উঠেন। কাজে লাগান তাদের পছন্দের রাজনৈতিক শক্তিকে। তারা প্রতিক্রিয়া জানাতে থাকেন। প্রফেসর ইউনূস আবার দ্বিধাদ্বন্দ্বে। নির্বাচন তখন অনেকটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
দেশের ভেতরকার একটি শক্তি নানাভাবে চাপ দিতে থাকে। নির্বাচন ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। তা না হলে অন্য বিপদ হতে পারে। এরপরও নির্বাচনবিরোধী শক্তি থেমে যায়নি। ধীরে ধীরে তারা প্রশাসনকে কবজা করে নেয়। এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করে যাতে এক পর্যায়ে মনে হয়েছিল-প্রফেসর ইউনূসকে হটিয়ে তারা ক্ষমতার মসনদে চলে যাবে। পর্দার আড়ালের তৎপরতার উপর প্রধান রাজনৈতিক শক্তি খুব কাছে থেকেই নজর রাখছিল। তারা বরাবরই নির্বাচন চেয়েছে । কোনো হঠকারী সিদ্ধান্তে তারা প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। মব সন্ত্রাস প্রশাসনের গতি থামিয়ে দিচ্ছিল বারবার। প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে যেদিন আগুন সন্ত্রাস হলো সেদিনের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলেই অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া যায়। প্রশাসনকে কারা নির্দেশ দিয়েছিল পুলিশ যাতে সময়মতো না যায়! বাস্তবে তাই ঘটেছিল। পুলিশ অনেক বিলম্বে ঘটনাস্থলে পৌঁছে। সেখানে পুলিশের বড় কর্তার ভূমিকা ছিল বেশ রহস্যজনক।
প্রফেসর ইউনূসকেও অন্ধকারে রাখা হয়। পরে তিনি একজন সিনিয়র সাংবাদিককে বলেছেন, তখন তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন। কিছুই জানতেন না। এর আগে ওসমান হাদীর মৃত্যু ঘিরে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয় দেশে। এই সুযোগও নিতে চেয়েছিলেন কেউ কেউ। তবে সেনাবাহিনী ছিল সতর্ক। রাজনৈতিক শক্তিগুলো ছিল তৎপর। সোশ্যাল মিডিয়া পর্যালোচনা করলে আরও কিছু আলামত পাওয়া যায়। যাইহোক, উল্লিখিত উপদেষ্টারা শুধু দেশে নয়, বিদেশে গিয়েও নানা কূটকৌশলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। একজন উপদেষ্টা দক্ষিণ এশিয়ার একটি দেশে গিয়ে একদিন তো নিখোঁজই হয়ে গিয়েছিলেন। বাংলাদেশের মিশন তাকে হন্যে হয়ে খুঁজেছে। তার হদিস পাওয়া যায়নি তখন। এই উপদেষ্টারা জনমত জরিপের পেছনেও সক্রিয় ছিলেন। বেশিরভাগ জনমত জরিপ ছিল ফরমায়েশি এবং বাস্তবতা বিবর্জিত।
টেবিলে বসেই অনেকগুলো তৈরি করা হয়। দূতাবাসগুলোতে তাদের বিচরণ ছিল। তারা বিদেশি কূটনীতিকদের বারবারই বলেছেন, নির্বাচনে অপ্রত্যাশিত শক্তির উত্থান ঘটবে। জনমত জরিপ তাই বলছে। নির্বাচনের দিনেও তাদের তৎপরতা ছিল। তাদের নজর ছিল পছন্দের আসনগুলোর দিকে। বেশ কিছু আসনের ফলাফল পর্যালোচনা করলে অবিশ্বাস্য কিছু তথ্য পাওয়া যায়। যদিও সন্ধ্যা থেকেই তারা অনুমান করতে থাকেন পরিস্থিতি তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। নির্বাচন নিয়ে কোনো খেলা তাদের বিপদ ডেকে আনবে। তাই তারা প্ল্যান ২ বাস্তবায়ন থেকে বিরত থাকেন। কী ছিল তাদের পরিকল্পনা।
