নোয়াখালির পাশের একটি জেলায় বাড়ছে এইডস রোগী, বেশিরভাগই পুরুষ সমকামী ও যৌনকর্মী

কুমিল্লায় এইচআইভি-এইডস সংক্রমণের হার বেড়েই চলেছে। গত পাঁচ মাসে এই রোগে আক্রান্ত হয়ে জেলায় মোট সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে আক্রান্ত হয়েছেন আরও ৩৭ জন।

কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ (কুমেক) হাসপাতালে বর্তমানে ১৫ জেলার মোট ৫৪৬ জন চিকিৎসা নিচ্ছেন। এদের মধ্যে শুধু কুমিল্লা জেলার বাসিন্দা ৩৮৫ জন। আক্রান্তদের মধ্যে বেশিরভাগই পুরুষ সমকামী ও যৌনকর্মী।

কুমেকের এইচআইভি এইডস এইচটিসি/এআরটি সেন্টারের কাউন্সিলর কাম অ্যাডমিন মো. আরিফ হাসান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

তিনি জানান, মে মাসের ২৫ তারিখে ২১ বছর বয়সী একজন, ১৩ মে ৪৯ বছর বয়সী একজন এবং ৮ মে ৩৫ বছর বয়সী একজন এইচআইভি আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এরা তিনজনই পুরুষ এবং কুমিল্লার বাসিন্দা।

২০২১ সালে ২১ বছর বয়সী যুবক এইচআইভি আক্রান্তের বিষয়টি নিশ্চিত হলেও অপর দুজনের শেষ মুহূর্তে এইচআইভি সংক্রমণ পজিটিভ ধরা পড়ে।

কুমিল্লায় বাড়ছে এইডস রোগী, বেশিরভাগই পুরুষ সমকামী ও যৌনকর্মী

চলতি বছরেই কুমিল্লায় এইচআইভি আক্রান্ত মোট সাতজনের মৃত্যুর হয়েছে। এদের মধ্যে জানুয়ারি মাসে দুজন, মার্চে একজন, এপ্রিলে একজন এবং মে মাসে তিনজনের মৃত্যু হয়।

নিহত ২১ বছর বয়সী ওই যুবকের স্ত্রী জানান, তার স্বামী কুমিল্লা ইপিজেডের একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। তাদের বিয়ের আগেই এইচআইভি পজিটিভ ধরা পড়ে। তবে বিয়ের সময় বিষয়টি গোপন রাখা হয়। স্বামীর মৃত্যুর কিছুদিন আগে ঢাকার এক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি (স্বামী) জানতে পারেন, এইডসে আক্রান্ত। স্বামীর মৃত্যুর পর কুমিল্লা মেডিকেলে পরীক্ষা করিয়ে জানতে পারেন, তিনিও এইচআইভিতে আক্রান্ত। বর্তমানে তিনিও কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তাদের একটি শিশু সন্তান রয়েছে।

এইচআইভি এইডস এইচটিসি/এআরটি সেন্টারের সূত্রমতে, কুমিল্লা জেলায় বর্তমানে ৩৮৫ জন এইচআইভি আক্রান্ত রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত ৬৭২ জনের নমুনা পরীক্ষায় ৩৭ জনের এইচআইভি শনাক্ত হয়। এদের মধ্যে পাঁচজন পুরুষ যৌনকর্মী, ১৮ জন পুরুষ সমকামী, বিবাহিত সম্পর্ক থেকে তিনজন, সাধারণ মানুষ দুজন, বিদেশফেরত দুজন, নারী যৌনকর্মীর গ্রাহক একজন এবং অন্যান্য ছয়জন।

২০১৯ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত কুমেকে ছয় হাজার ৬৪৬টি পরীক্ষায় ২৭৮ জনের এইচআইভি শনাক্ত হয়। এর মধ্যে ৪০ জন টিবিতেও (যক্ষ্মা) আক্রান্ত।

বর্তমানে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কুমিল্লা, নোয়াখালী, চাঁদপুর, ফেনী, লক্ষ্মীপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, খাগড়াছড়ি, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, সাতক্ষীরা, নরসিংদী, কুড়িগ্রাম, ঝিনাইদহ, হবিগঞ্জ এবং বান্দরবান জেলার ৫৪৬ জন রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। একই সময়ে ৪৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। চিকিৎসা ছেড়ে দিয়েছেন ১৩ জন।

পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, কুমিল্লা এআরটিতে ২০১৯ সালে ২২৬ জনের পরীক্ষায় ১৫ জন, ২০২০ সালে ৩১১ জনের পরীক্ষায় আটজন,
২০২১ সালে ৪৯৮ জনের পরীক্ষায় ১৪ জন, ২০২২ সালে ৭৮৬ জনের পরীক্ষায় ২১ জন, ২০২৩ সালে এক হাজার ২৩০ জনের পরীক্ষায় ৪৮ জন, ২০২৪ সালে এক হাজার ৪৮১ জনের পরীক্ষায় ৫৮ জন, ২০২৫ সালে এক হাজার ৪৪২টি পরীক্ষায় ৭২ জন এবং চলতি বছরের মে পর্যন্ত ৬৭২ জনের পরীক্ষায় ৩৭ জনের রিপোর্ট পজিটিভ আসে।

আরিফ হাসান বলেন, ‘সবচেয়ে শঙ্কার বিষয় হলো আগে বেশিরভাগ সংক্রমণই রক্ত আদান প্রদানের মাধ্যমে ছড়ালেও এখন যেসব কেসগুলো পাওয়া যাচ্ছে, তাতে যৌনবাহিত বলেই শনাক্ত হচ্ছে। ২০১৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত যতজন শনাক্ত হয়েছেন, তার মধ্যে বেশিরভাগই পুরুষ থেকে পুরুষে যৌন সম্পর্কিত ৯১ জন, পুরুষ যৌনকর্মী ৪০ জন এবং প্রবাস থেকে ফেরত আসা ৪৯ জন। এইচআইভি সংক্রমিত বিবাহিত সঙ্গী থেকে সংক্রমিত হয়েছে ৪১ জন ও নারী যৌনকর্মী থেকে ছড়িয়েছে ২১ জন। তবে এর মধ্যে সাধারণ মানুষের সংখ্যা ৩২ জন।

এ বিষয়ে কুমিল্লা জেলা সিভিল সার্জন ডা. আলী নুর মোহাম্মদ বশির আহমেদ বলেন, ‌‘রক্ত ও যৌনতার মাধ্যমে এইচআইভি সংক্রমণ ছড়াই। সংক্রমণ থেকে বাঁচতে রক্ত আদান-প্রদানের সময় ভালোভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে। বিশেষ করে ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলতে হবে এবং যৌন সচেতনতা বাড়াতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, এইচআইভি পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং ওষুধ সরকারিভাবে বিনামূল্যে দেওয়া হয়। যদি কারও এ ধরণের লক্ষণ দেখা দেয়, দ্রুত কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দেন তিনি।