২০১৩ সালের ৫ মে দিবাগত রাতে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল দিগন্ত টিভি ও ইসলামিক টিভি তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু এবং তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীরের সরাসরি লিখিত আদেশে বন্ধ করেন পুলিশ কর্মকর্তা মোল্লা নজরুল। চ্যানেল 24-এর হাতে আসা তদন্ত প্রতিবেদনে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে জানা যায়, কুরআন-সুন্নাহবিরোধী সব আইন বাতিল, ধর্মের অবমাননাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তির বিধানসহ ১৩ দফা দাবিতে ২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকার মতিঝিলের শাপলা চত্বরে সমাবেশ ডাকে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। সারাদেশ থেকে মাদরাসা শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা রাজধানীর চারটি পয়েন্টে জড়ো হতে থাকেন।
একদিকে দুপুরের পর সমাবেশের অনুমতি দেয়া হলেও অন্যদিকে রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে দাঁড়িয়ে সমাবেশে যেতে বাধা দেয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। দিনভর হেফাজতের সঙ্গে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ চলে। রাতে বিদ্যুৎ বন্ধ করে অভিযান চালানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে, যা তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার বরাবরই অস্বীকার করে এসেছে।
চ্যানেল 24-এর হাতে আসা তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শাপলা চত্বরের ঘটনায় ৩০ জনের বেশি ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, গণভবন থেকে এই অভিযানের নির্দেশ আসে এবং প্রধান আসামি করা হয়েছে শেখ হাসিনাকে। এ ছাড়া তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীর, প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, তৎকালীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, যুবলীগ সভাপতি ওমর ফারুক, গণজাগরণ মঞ্চের ইমরান এইচ সরকার, শাহরিয়ার কবীর, তৎকালীন আইজিপি হাসান মাহমুদ খোন্দকার, পুলিশ কর্মকর্তা শহীদুল হক, ডিএমপি কমিশনার বেনজীর আহমেদ, র্যাবের ডিজি মোখলেসুর রহমান, জিয়াউল আহসানসহ পুলিশের আরও কয়েকজন কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, পরিকল্পিতভাবে হেফাজতের নেতাকর্মীদের ঢাকায় আনা হয়। সারাদিন তাদের বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হয় এবং পরে যেসব ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে, তা গণমাধ্যমে প্রচার করে তাদের হেয় করার চেষ্টা করা হয়—এমন অভিযোগ প্রতিবেদনে রয়েছে। রাত ১০টার পর শাপলা চত্বরে অভিযান চালানোর নির্দেশ দেয়া হয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর রাত ১টা ৪৫ মিনিটে বিদ্যুৎ নিভিয়ে এক দিক খোলা রেখে সমন্বিতভাবে অভিযান চালায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
তবে তদন্ত প্রতিবেদনে ওই ঘটনায় মোট কতজন নিহত হয়েছেন, তা চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা হয়নি। প্রতিবেদনে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের মৃতদের নিয়ে অধিকার সংস্থার রিপোর্টকে ভিত্তি ধরা হয়েছে। তবে মুন্সিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও নরসিংদীর ঘটনার তদন্ত অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। শাপলা চত্বরের ঘটনায় গ্রেপ্তার আছেন সাবেক আইজিপি শহীদুল হক, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, শাহরিয়ার কবীর ও মোল্লা নজরুল।
তবে প্রশ্ন উঠতে পারে, তদন্ত শেষ হওয়ার পরও কেন প্রতিবেদন প্রসিকিউশনের কাছে দেয়া হচ্ছে না। জানা যায়, ৫ মে রাতে দিগন্ত টিভি ও ইসলামিক টিভি সরাসরি গিয়ে বন্ধ করেন তৎকালীন পুলিশ কর্মকর্তা মোল্লা নজরুল। কিন্তু পুলিশের একটি অংশ তাকে আসামি করতে আগ্রহী নয়। তাদের বক্তব্য, মোল্লা নজরুলকে চ্যানেল দুটি বন্ধ করতে লিখিত নির্দেশ দেন তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী ইনু ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীর। এখানে মোল্লা নজরুল কেবল আদেশ পালন করেছেন, কাজেই তাকে আসামি করা যাবে না—এমন মত তাদের। এই প্রশ্নের সমাধান না হওয়ায় তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার বিষয়টি আটকে আছে।
৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পর এ ঘটনার তদন্ত চেয়ে ট্রাইব্যুনালে আবেদন জানায় হেফাজতে ইসলাম। জাতীয় নির্বাচনের আগেই ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা তদন্ত শেষ করেছে। তদন্ত প্রতিবেদনে কী আছে এবং আসামি কতজন, তা নিয়ে চলছে আলোচনা।
