মা-বোনসহ ঢাবি ছাত্রীকে কুপিয়ে হত্যা, ঘাতকের পরিচয় নিয়ে যা জানা গেল

লক্ষ্মীপুরের রায়পুর পৌর শহরে মা ও তিন মেয়েকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত অন্তর মজুমদার নিজেকে কল ও পাইপলাইনের মিস্ত্রি পরিচয় দিয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন প্রতিবেশী আফরোজা বেগম। তবে তার আচরণে সন্দেহ হওয়ায় আফরোজা তৎপরতায় পালাতে পারেননি। সে নিজেকে জহির নামে মুসলিম পরিচয় দিয়ে এক নারীকে নিয়ে ওই ভবনে এক বছর বসবাস করেছিলেন।

আফরোজা বেগম বলেন, বৃহস্পতিবার দুপুরে ঘটনার সময় তিনি অন্তরের হাতে প্যান্ট নিয়ে ঘরের ভেতরে দেখতে পান। জানালা দিয়ে সেখানে থাকার কারণ জানতে চাইলে নিজেকে কল ও পাইপলাইন মেরামতের মিস্ত্রি বলে পরিচয় দেন।

এ প্রসঙ্গে আফরোজার ভাষ্য, ‘তার (অন্তর) হাতে প্যান্ট ছিল। বিষয়টি আমার কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়। আমি ভাবলাম, হয়তো শাহিনুর বাসায় নেই। কলের মিস্ত্রি পরিচয়ে এসে মেয়েদের সঙ্গে খারাপ কিছু করেছে। তখনই আমার সন্দেহ হয়।’

এর কিছুক্ষণ আগে ওই ঘরের ভেতর থেকে ‘বাঁচাও, বাঁচাও’ চিৎকার শুনে জানালার পাশে দৌড়ে গিয়েছিলেন আফরোজা। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে শাহিনুর বেগমকে ডাকতে থাকেন, কিন্তু তার কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

ওই প্রতিবেশী বলেন, ‘প্রথমে চিৎকার শুনছিলাম। পরে হঠাৎ সব চুপ হয়ে যায়। অনেকক্ষণ পর জানালা দিয়ে দেখি একজন রান্নাঘরের দিকে যাচ্ছে। আমি ভেবেছিলাম, ওটা হয়তো শাহিনুরের ছেলে সিফাত। আমি সিফাত বলে ডাকলাম, কিন্তু তারও কোনো উত্তর পাইনি। কিছুক্ষণ পর আড়াল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জানালা বন্ধ করার শব্দ শুনি। তখন আমার সন্দেহ আরও বেড়ে যায়।’

পরিস্থিতি অস্বাভাবিক মনে হওয়ায় আফরোজা বাইরে থেকে বাসার দরজা আটকে দেন এবং আশপাশের লোকজনকে খবর দেন। পরে প্রতিবেশীরা একসঙ্গে ঘরে ঢুকে মেঝে জুড়ে রক্ত এবং মা ও তিন মেয়েকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন।

এ সময় অভিযুক্ত অন্তর মজুমদার পালানোর জন্য ভবনের ছাদে উঠে যান। পরে স্থানীয় লোকজন তাকে আটক করে গণপিটুনি দেন। গুরুতর আহত অবস্থায় পুলিশ তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয়। সেখানে চিকিৎসাধীন বেলা আড়াইটার দিকে তার মৃত্যু হয়।

রায়পুর পৌরসভার ধানহাটা এলাকার নদীর পাড়ের স্কুল শিক্ষকের ভাড়া বাসায় এ নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এতে নিহত হন শাহিনুর বেগম (৩৮) এবং তার তিন মেয়ে সাইমা আক্তার (২০), ইকরা বেগম (১৭) ও সিপা (৯)। নিহত সায়মা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ইকরা রায়পুর কাজী ফারুকী কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী ছিলেন। তাদের বাড়ি কুমিল্লার হোমনা উপজেলায়। গত ২৫-২৬ বছর ধরে তারা রায়পুরে ভাড়া বাসায় বসবাস করছিলেন। তাদের পিতা কামাল হোসেন ২০১৯ সালে কেরোয়া গ্রামে রাস্তায় পড়ে থাকা তারে বিদ্যুৎস্পর্শে মারা যান।

আর অভিযুক্ত অন্তর মজুমদার (২৮) নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার দাসেরহাট বাসিন্দা। স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য অনুযায়ী, অন্তর রায়পুরে ভাসমান ফল বিক্রেতা হিসেবে কাজ করতেন। শুক্রবার দুপুরে তার মরদেহ এক চাচাতো ভাই পুলিশের কাছ থেকে নিয়ে যায়।

এদিকে এ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় লক্ষ্মীপুর জেলা ছাত্রছাত্রী কল্যাণ সমিতির উদ্যোগে মানববন্ধন হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাত ৮টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের সামনে এ মানববন্ধন করা হয়েছে।

শনিবার সকালে (২৭ জুন) লক্ষ্মীপুর-২ রায়পুর আসনের এমপি আবুল খায়ের ভুঁইয়া ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। প্রকৃত খুনি কে- তা তদন্ত করে বের করার নির্দেশ দিয়েছেন। বৃহস্পতিবার রাতেও চট্রগ্রাম বিভাগীয় পুলিশের ডিআইজি মনিরুজ্জামান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। নির্মম হত্যাকাণ্ডটি পুলিশ, সিআইডি ও র‌্যাব তদন্ত করছে। এ ঘটনায় নিহতদের ছেলে জিহাদুল ইসলাম শিফাত বাদী হয়ে আসামি ও অজ্ঞাত আসামিদের নামে হত্যা মামলা এবং অভিযুক্তকে গণপিটুনি দিয়ে হত্যায় ও এ সময় তাকে বাঁচাতে গিয়ে ৭ পুলিশ সদস্য আহত হওয়ার ঘটনায় এসআই আমিনুল ইসলাম বাদী করে অজ্ঞাতদের আসামি করে হত্যা মামলা হয় রায়পুর থানায়। এ দুটি হত্যা মামলাই তদন্ত করছেন ওসি (তদন্ত) মো. আবদুল মান্নান।

রায়পুর থানার ওসি শাহীন মিয়া বলেন, ঘটনাস্থল থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি দা আলামত হিসেবে জব্দ করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, একজনই এ হত্যাকাণ্ড ঘটান। হত্যার মূল কারণ এখনো উদঘাটন করা যায়নি। প্রকৃত কারণ জানতে পুলিশের একাধিক দল কাজ করছে। শুক্রবার দুপুরে মা, তিন মেয়েকে ছেলে শিফাতসহ তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।