রাষ্ট্রপতিসহ সম্ভাব্য মন্ত্রিসভায় আলোচনায় যারা

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকারের নতুন মন্ত্রিসভা হতে পারে ৪২ সদস্যের। এতে ঠাঁই পেতে পারেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমেদ-এর মতো নেতারা। টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী হিসেবে আলোচনায় আছেন নজরুল ইসলাম খান, রুহুল কবীর রিজভী, আমিনুল হকসহ কয়েকজন। জোটসঙ্গী হিসেবে মন্ত্রিসভায় থাকতে পারেন আন্দালিব রহমান পার্থ, জোনায়েদ সাকি ও ববি হাজ্জাজ। এছাড়া সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি হিসেবে কারও কারও কাছে আলোচনায় নাম রয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের।

সূত্রগুলো বলছে, এবার বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পেতে পারেন যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেতে পারেন আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় পেতে পারেন আব্দুল আউয়াল মিন্টু। সড়ক পরিবহনের দায়িত্ব পেতে পারেন সালাহউদ্দিন আহমেদ। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেতে পারেন এহসানুল হক মিলন। ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু দায়িত্ব পেতে পারেন জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের। মেজর হাফিজ উদ্দিন আহম্মদ পেতে পারেন পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব, আর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব যেতে পারে ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেনের কাছে।

মন্ত্রিসভায় আরও জায়গা পেতে পারেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আব্দুল মঈন খান ও ওয়াদুদ ভূইয়া। দায়িত্ব পেতে পারেন সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল আসাদুজ্জামান আসাদ। এছাড়াও আলোচনায় আছেন ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, কিশোরগঞ্জ-৪ আসনে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ফজলুর রহমান, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দীন চৌধুরী শামা ওবায়েদ, আসাদুল হাবীব দুলু, রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু ও রকিবুল ইসলাম বকুল।

টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী হিসেবে আলোচনায় আছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, বেগম সেলিমা রহমান, বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ইসমাঈল জবিউল্লাহ, হুমায়ূন কবীর, জিয়া হায়দার ও আমিনুল হকসহ কয়েকজন। এদিকে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবীর রিজভী এবং যুগ্ম মহাসচিব হাবীব-উন-নবী খান সোহেলও আলোচনায় রয়েছেন। এছাড়াও, মন্ত্রিসভায় বিএনপি জোটের শরিকদের মধ্যে আলোচনায় আছেন আন্দালিব রহমান পার্থ, জোনায়েদ সাকি, নুরুল হক নুর ও ববি হাজ্জাজসহ আরও কয়েকজন।

অন্যদিকে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি বলছে, বাংলাদেশে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রাক্কালে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের পরবর্তী ভূমিকা নিয়ে জোর জল্পনা শুরু হয়েছে। তার মেয়াদ শেষের পথে থাকায় রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে— তিনি কি সাংবিধানিক কোনও পদে থেকে যাবেন?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুঞ্জন রয়েছে, মঙ্গলবার দায়িত্ব নিতে যাওয়া বিএনপি সরকারের সমর্থনে তিনি রাজনৈতিক কাঠামোর ভেতরে কোনও সাংবিধানিক পদে থাকতে পারেন। এছাড়া তারেক রহমান নিজেও দেশের সেরা মেধাবীদের সম্পৃক্ত করার পক্ষে— এমনটাই এনডিটিভিকে জানিয়েছেন তার উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ কারও জন্যই এখনও নির্দিষ্ট কোনও পদ চূড়ান্ত করা হয়নি। তবে দেশের ভবিষ্যৎ গঠনে সক্ষম ব্যক্তিদের সঙ্গে পরামর্শ করতে চান তারেক রহমান।

এনডিটিভিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তারেক রহমানের আন্তর্জাতিকবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, ‘কোনও নির্দিষ্ট পদ নিয়ে আলোচনা হয়নি। আলোচনা ছিল অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনব্যবস্থা নিয়ে তারেক রহমান সাহেবের আগ্রহকে কেন্দ্র করে। তিনি নির্বাচিত হলে সব ধরনের মেধাকে কাজে লাগিয়ে দেশ পরিচালনা করতে চান।’

তিনি আরও বলেন, ‘আপনার দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও আন্তর্জাতিক মর্যাদা দেশের স্বার্থে নানা উপায়ে কাজে লাগানো যেতে পারে। নির্দিষ্ট কোনও ভূমিকা নির্ধারণ করা হয়নি। তবে নির্বাচনের পর সুবিধাজনক সময়ে দেশের বিশিষ্ট নাগরিকদের সঙ্গে পরামর্শ করতে চান তিনি। সেই প্রেক্ষাপটে অধ্যাপক ড. ইউনূসের সঙ্গেও আলোচনা হতে পারে।’

হুমায়ুন কবির বলেন, ‘রাজনীতিতে কিছুই অসম্ভব নয়। তারেক রহমান এমন সিদ্ধান্ত নেবেন, যা দেশকে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শক্ত অবস্থানে নিয়ে যাবে। তিনি উন্নয়নের দৃষ্টিভঙ্গিকে কেবল দলীয় সীমায় আটকে রাখতে চান না। প্রয়োজনে পরিসর বাড়াতে প্রস্তুত আছেন। দেশের স্বার্থে কারও বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের প্রয়োজন হলে তাকে সঙ্গে নেবেন।’

তবে তিনি আবারও স্পষ্ট করে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত কোনও নির্দিষ্ট পদ নিয়ে আলোচনা হয়নি।’

অন্যদিকে বাংলাদেশ নিয়ে নিয়মিত লেখেন কলামিস্ট ডেভিড বার্গম্যান বলেছেন, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে শক্ত অবস্থানের কারণে ড. মুহাম্মদ ইউনূস রাষ্ট্রপতি হলে বাংলাদেশ উপকৃত হতে পারে।

সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্স-এ দেয়া এক পোস্টে বার্গম্যান লেখেন, ‘ড. ইউনূস রাষ্ট্রপতি হলে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্যভাবে লাভবান হতে পারে। দেশের ভেতরে কিছু সমালোচনা থাকলেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার প্রতি ব্যাপক সম্মান রয়েছে এবং অন্য কোনও বাংলাদেশির তেমন বৈশ্বিক অবস্থান নেই। অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মনোযোগী এক প্রধানমন্ত্রী ও আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন এক রাষ্ট্রপতির সমন্বয় দেশের জন্য কার্যকর হতে পারে।’

বার্গম্যান আরও দাবি করেন, তারেক রহমান ও ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আলোচনায় রাষ্ট্রপতির পদও উঠে এসেছিল। তবে তারেক রহমানের দল এবং ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রেস সচিব— দু’পক্ষই এমন কোনও আলোচনার কথা অস্বীকার করেছেন।

ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনে শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি ও পলায়নের পর দেশ পরিচালনা করেছেন ড. ইউনূস। তাকে সরকার বা সাংবিধানিক কাঠামোর কোনও উপযুক্ত পদে পুনর্বাসন করা সহজ হবে না বলে মনে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে তারেক রহমানের জন্য ড. ইউনূস গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হতে পারেন।

অবশ্য ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রেস সচিব শফিকুল আলম এনডিটিভিকে বলেছেন, প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব শেষে ড. ইউনূস অন্য কোনও দায়িত্ব নিতে চান— এমন খবর সঠিক নয়। তিনি বলেন, ‘তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হলো আগের কাজে ফিরে যাওয়া। তিনি থ্রি জিরো (শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব, শূন্য নিট কার্বন নিঃসরণ) ধারণা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে চান। এ নিয়ে তিনি বিশ্বজুড়ে কথা বলেন। নতুন কিছু সামাজিক ব্যবসা উদ্যোগও গড়ে তুলবেন। এছাড়া তরুণদের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহও প্রকাশ করেছেনে তিনি।’

তিনি আরও বলেন, ‘তার (ড. মুহাম্মদ ইউনূস) রাজনীতিতে কোনও আগ্রহ নেই। কোনও সাংবিধানিক পদেও ( তিনি আগ্রহী) নয়। তিনি মনে করেন, দেশের সংকটময় সময়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেয়েছিলেন এবং দেশকে শান্তি ও স্থিতিশীলতার পথে এগিয়ে নিয়েছেন। নির্ধারিত লক্ষ্যগুলোর বেশিরভাগই অর্জিত হয়েছে। এখন ক্ষমতা নতুন সরকারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।’

তবে এখন পর্যন্ত ড. ইউনূস নিজেও তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে প্রকাশ্যে কিছু বলেননি। তবে প্রধান উপদেষ্টার পদ ছেড়ে নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের পর তিনি এ বিষয়ে খোলামেলা কথা বলতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।