সুরা ইউনুসে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ নিয়ে যে সুসংবাদ অনেকের অজানা

দৈনন্দিন জীবনে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ শব্দটি আমরা এত সহজে, এত অভ্যাসবশত উচ্চারণ করি যে অনেক সময় এর গভীরতা আমাদের চোখ এড়িয়ে যায়। কেউ ভালো খবর পেলে বলেন আলহামদুলিল্লাহ, কেউ বিপদ থেকে বাঁচলে বলেন আলহামদুলিল্লাহ, আবার নিছক প্রশ্নের জবাবেও অনেকে অভ্যাসবশত বলে ফেলেন আলহামদুলিল্লাহ। অথচ কোরআনের একটি আয়াতে এই শব্দটিকে ঘিরে এমন একটি চিত্র আঁকা হয়েছে, যা পড়লে বোঝা যায়- এই ছোট্ট শব্দটি আসলে কতটা মহিমান্বিত।

সুরা ইউনুসের একটি আয়াত: কম আলোচিত, অথচ অসাধারণ

সুরা ইউনুসের ১০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা জান্নাতবাসীদের একটি বিশেষ অবস্থার বর্ণনা দিয়েছেন। সেখানে বলা হয়েছে, “সেখানে তাদের কথা হবে- ‌‌‘সুবহানাল্লাকা আল্লাহুম্মা’ (হে আল্লাহ, আপনি পবিত্র) এবং তাদের অভিবাদন হবে, ‘সালাম’। আর তাদের শেষ কথা হবে যে, ‘আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামিন’ (সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি সকল সৃষ্টির রব)।” (সুরা ইউনুস: ১০)

এই আয়াতটি সাধারণত ‘আলহামদুলিল্লাহ’-এর ফজিলত নিয়ে আলোচিত অন্যান্য হাদিসের তুলনায় কম আলোচিত হয়। অথচ এতে এমন একটি দৃশ্য ফুটে ওঠে, যা গভীরভাবে ভাবিয়ে তোলে। জান্নাত- যেখানে কোনো অভাব নেই, কোনো কষ্ট নেই, কোনো অপূর্ণতা নেই, সেই পরিপূর্ণ সুখের স্থানেও বান্দাদের শেষ কথা হবে ‘আলহামদুলিল্লাহ’। অর্থাৎ প্রাপ্তি যতই পূর্ণ হোক, আল্লাহর প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা কখনো শেষ হবে না।

কেন এই আয়াতটি এত তাৎপর্যপূর্ণ?

দুনিয়াতে আমরা সাধারণত কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি কোনো নেয়ামত লাভ করলে, কোনো বিপদ কেটে গেলে বা কোনো চাওয়া পূরণ হলে। কিন্তু জান্নাতে তো আর কোনো অভাব বা কষ্ট থাকবে না। তবুও আল্লাহ তাআলা জানিয়ে দিয়েছেন, জান্নাতবাসীদের মুখেও শেষ কথাটি হবে ‘আলহামদুলিল্লাহ’।

কোরআনের এই আয়াত আমাদের শেখায়, ‘আলহামদুলিল্লাহ’ শুধু কোনো সুখবরের পর বলা একটি বাক্য নয়; এটি একজন মুমিনের স্থায়ী পরিচয়। পৃথিবীতে যার জিহ্বা আল্লাহর প্রশংসায় অভ্যস্ত, জান্নাতেও তার মুখে থাকবে একই প্রশংসা।

তাফসিরবিদগণ উল্লেখ করেছেন, এই আয়াত থেকে বোঝা যায়- জান্নাতবাসীদের জীবন, দোয়া ও কথোপকথন আল্লাহর জিকির, পবিত্রতা ঘোষণা এবং প্রশংসায় পরিপূর্ণ থাকবে। আল্লাহর প্রশংসা করা সেখানে স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দ ও চিরস্থায়ী সৌভাগ্যের প্রকাশ। (দেখুন: তাফসির ইবন কাসির, সুরা ইউনুস: ১০)

কোরআন ও হাদিসের সুন্দর মিল
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তাঁর সেই বান্দার প্রতি সন্তুষ্ট হন, যে কিছু খেয়ে বা পান করে তাঁর প্রশংসা করে (আলহামদুলিল্লাহ পাঠ করে)।’ (সহিহ মুসলিম: ২৭৩৪)

অর্থাৎ পৃথিবীতে যে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ আল্লাহর সন্তুষ্টির কারণ হয়, কোরআন আমাদের জানাচ্ছে- আখেরাতে জান্নাতবাসীদের মুখেও থাকবে সেই একই প্রশংসা। এ যেন দুনিয়ার একজন মুমিনকে জান্নাতের জীবনধারার একটি ঝলক দেখিয়ে দেওয়া।

কৃতজ্ঞতার এই শিক্ষা যেভাবে জীবনে প্রয়োগ করা যায়
এই আয়াতের আলোকে কয়েকটি বিষয় প্রতিদিনের জীবনে চর্চা করা যেতে পারে।

প্রথমত, শুধু বড় প্রাপ্তির সময় নয়; ছোট ছোট নেয়ামতের জন্যও ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলার অভ্যাস গড়ে তোলা। একটি সুস্থ সকাল, একটি নিরাপদ দিন, একবেলা আহার- এসবও কৃতজ্ঞতার দাবি রাখে।

দ্বিতীয়ত, কষ্টের সময়েও ধৈর্যের সঙ্গে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলা। এটি কষ্টকে অস্বীকার করা নয়; মূলত এটি আল্লাহর ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্টি ও আস্থার প্রকাশ।

তৃতীয়ত, দোয়া ও জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে আল্লাহর প্রশংসাকে স্থান দেওয়া। কারণ কোরআন আমাদের জানিয়ে দিয়েছে, জান্নাতের পরিবেশই হবে আল্লাহর জিকির ও প্রশংসায় পরিপূর্ণ।