বিপদ সংকেত, কী ঘটবে যদি বাংলাদেশে মেঘভাঙা বৃষ্টি নামে?

সাম্প্রতিক সময়ে এল নিনো নিয়ে বিশ্বজুড়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা। প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের পানি অস্বাভাবিকভাবে উষ্ণ হয়ে ওঠার এই প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ঘটনা সাধারণত কয়েক বছর পরপর ঘটে এবং বিশ্ব আবহাওয়ায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলে।

আবহাওয়া পূর্বাভাস সংস্থাগুলোর নতুন বিশ্লেষণ বলছে, এবার ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী এল নিনো ধেয়ে আসতে পারে। এতে আগামী বিশ্বজুড়ে রেকর্ড তাপমাত্রা, খরা, অতিবৃষ্টি, বন্যা, খাদ্যসংকটসহ বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এর মধ্যেই প্রশ্ন উঠছে—এল নিনোর প্রভাবেই কি বাংলাদেশে চলতি গ্রীষ্মে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বৃষ্টিপাত দেখা যাচ্ছে?

এই প্রশ্নের উত্তর নিয়ে যখন আলোচনা চলছে, তখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে ‘মেঘভাঙা বৃষ্টি’ বা ক্লাউডবার্স্ট। ভারতের দিকে ধেয়ে আসা বিশাল মেঘমালার উপগ্রহ চিত্র সামনে আসার পর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, পার্শ্ববর্তী দেশ হিসেবে এর প্রভাব কি বাংলাদেশেও পড়তে পারে?

তবে আবহাওয়াবিদরা বলছেন, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত মেঘভাঙা বৃষ্টির কোনও ঝুঁকি নেই।

উল্লেখ্য, গত বছরের ৫ আগস্ট ভারতের উত্তরাখণ্ডের উত্তরকাশীর ধরালি গ্রামে মেঘভাঙা বৃষ্টিতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।

মেঘভাঙা বৃষ্টি কী?

আবহাওয়া অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, কোনও ছোট এলাকায় (প্রায় ১ থেকে ১০ কিলোমিটার) এক ঘণ্টায় ১০ সেন্টিমিটার বা তার বেশি বৃষ্টিপাত হলে তাকে ক্লাউডবার্স্ট বা মেঘভাঙা বৃষ্টি বলা হয়।

এ ধরনের বৃষ্টিতে স্বল্প সময়ে অতি ভারী বৃষ্টিপাত ঘটে, যা স্বাভাবিক ভারী বৃষ্টির তুলনায় অনেক বেশি তীব্র ও ক্ষতিকর।

কেন ঘটে এই ঘটনা?

আবহাওয়াবিদদের মতে, উষ্ণ ও ঠান্ডা বায়ুর সংঘর্ষে ঘন মেঘ তৈরি হয়। উষ্ণ বায়ু দ্রুত ওপরে উঠতে থাকলে মেঘে থাকা জলকণা বৃষ্টির আকারে নেমে আসার সুযোগ পায় না, বরং মেঘের ভেতরেই জমতে থাকে।

পাহাড়ি অঞ্চলে এই প্রক্রিয়া আরও সক্রিয় হয়, যাকে বলা হয় ‘অরোগ্রাফিক লিফট’। এতে পাহাড়ে বাধা পেয়ে আর্দ্র বাতাস দ্রুত ওপরে উঠে ঘনীভূত মেঘ তৈরি করে।

একপর্যায়ে মেঘ অতিরিক্ত পানি ধারণ করতে না পেরে হঠাৎ প্রবল বৃষ্টির আকারে নেমে আসে।

কী ধরনের ক্ষতি হতে পারে?

মেঘভাঙা বৃষ্টি হলে অল্প সময়েই ফ্ল্যাশ ফ্লাড বা আকস্মিক বন্যা দেখা দিতে পারে। পার্বত্য এলাকায় এর সঙ্গে ভূমিধসের ঝুঁকিও থাকে।

পাহাড়ি ঢাল বেয়ে নেমে আসা পানির সঙ্গে কাদা ও পাথর মিশে বড় ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টি করতে পারে।

এর আগে ভারতের উত্তরাখণ্ড, সিকিম ও লাদাখে এমন ঘটনা ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কারণ হয়েছে।

পূর্বাভাস কি সম্ভব?

বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্লাউডবার্স্ট খুবই ছোট এলাকা ও স্বল্প সময়ে ঘটে বলে নির্দিষ্টভাবে আগাম পূর্বাভাস দেওয়া কঠিন।

আবহাওয়া অধিদফতর বিস্তৃত এলাকায় ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দিতে পারলেও নির্দিষ্ট জায়গায় মেঘভাঙা বৃষ্টি কোথায় হবে, তা নির্ধারণ করা প্রায় অসম্ভব।

কোথায় ঝুঁকি বেশি?

বিশ্বের হিমালয় সংলগ্ন অঞ্চল—বিশেষ করে উত্তরাখণ্ড, সিকিম ও লাদাখ—এ ধরনের ঘটনার জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ।

এই অঞ্চলে মৌসুমি বায়ু প্রচুর আর্দ্রতা নিয়ে আসে এবং সংকীর্ণ উপত্যকার কারণে পানি দ্রুত নিষ্কাশিত হতে পারে না, ফলে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ে।

কেন বাড়ছে ঝুঁকি?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টিপাতের ধরন ও বায়ুচাপের পরিবর্তন ঘটছে। পাশাপাশি বন উজাড়, অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণ ও ভূমির ব্যবহার পরিবর্তনের ফলে পাহাড়ি অঞ্চলের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।

এতে মাটির পানি শোষণের ক্ষমতা কমে গিয়ে ভূমিধস ও বন্যার ঝুঁকি আরও বাড়ছে।