চার শতাধিক পুরুষের কাছে নিজের প্রেমিকাকে বিক্রি!

সম্প্রতি ফ্রান্সের আদালত কাঁপানো একটি মামলার রায় এবং ভুক্তভোগী নারীর লোমহর্ষক জবানবন্দি বিশ্বজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। ‘মনে হচ্ছিল আমি ভেতর থেকে মরে যাচ্ছি’- ফরাসি আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে এক সাবেক ব্যাংক ম্যানেজারের বিরুদ্ধে এভাবেই নিজের ওপর চলা সাত বছরের নারকীয় নির্যাতনের বর্ণনা দেন ৪২ বছর বয়সী ল্যাটিটিয়া আর। তাঁর সাবেক প্রেমিক গুইলোম বুচ্চি তাঁকে শুধু শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতনই করেননি, বরং ব্ল্যাকমেইল করে বছরের পর বছর ধরে ঠেলে দিয়েছেন চার শতাধিক বেশি অচেনা পুরুষের শয্যায়।

বিচারের মুখোমুখি হয়ে অভিযুক্ত বুচ্চি শ্বাসরোধ করা, পুড়িয়ে দেওয়া কিংবা পশুর সাথে বিকৃত যৌনাচারের মতো পৈশাচিক সব কাণ্ড ঘটানোর কথা স্বীকার করেছেন। তবে নিজের অপরাধ ঢাকতে গিয়ে তিনি অত্যন্ত নির্লজ্জভাবে দাবি করেন, এগুলো ছিল তাদের গভীর সম্পর্কের রসায়নে তৈরি পারস্পরিক সম্মতির যৌন খেলা! সে নাকি বুঝতেও পারেনি যে, এর মাধ্যমে সে ল্যাটিটিয়াকে আঘাত করছিল।

চার সন্তানের জননী ল্যাটিটিয়া আদালতে জানান, ২০১৫ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সাত বছর ধরে বুচ্চি তাঁকে সম্পূর্ণ ‘মানসিক নিয়ন্ত্রণে’ রেখে এই চরম নির্যাতন ও ধর্ষণের মুখোমুখি হতে বাধ্য করে। শুরুতে বুচ্চি যখন স্যাডোম্যাসোকিস্টিক (যৌন বিকৃতির খেলা) সম্পর্কের কথা বলেছিল, তখন ল্যাটিটিয়া ভেবেছিলেন তা সাধারণ কোনো খুনসুটি বা হালকা বাঁধার মতো কিছু হবে। বুচ্চি তাঁকে আশ্বস্তও করেছিল যে, তাঁর ভালো না লাগলে তারা থেমে যাবে। কিন্তু পরবর্তীতে তা রূপ নেয় বিশুদ্ধ ও সাধারণ চরম সহিংসতায়। ল্যাটিটিয়া যদি তাঁকে ছেড়ে চলে যেতে চান, তবে তাঁদের ঘনিষ্ঠ ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে প্রতিনিয়ত তাঁকে বশ করে রাখা হতো।

ল্যাটিটিয়া জানান, এই ভয়াবহ নির্যাতন রাতারাতি শুরু হয়নি, বরং ধাপে ধাপে শুরু হয়েছিল। প্রথমে বুচ্চি তাঁকে অন্য পুরুষদের সাথে শারীরিক সম্পর্ক করতে প্ররোচিত করে। এরপর ২০১৫ সালের ক্রিসমাস ইভ বা বড়দিনের আগের রাতে সে ল্যাটিটিয়াকে এক মহাসড়কের সার্ভিস স্টেশনে অচেনা পুরুষদের কাছে নিজেকে সঁপে দিতে বাধ্য করে, আর নিজে ফোনে ওপাশ থেকে সেই শব্দ শুনছিল।

এটুকুর পরও ক্ষান্ত হয়নি সেই বিকৃতমনস্ক প্রেমিক। সে ল্যাটিটিয়াকে জোরপূর্বক দেহব্যবসায় নামায় এবং নিজের বন্ধু, সহকর্মী থেকে শুরু করে ইন্টারনেটে খুঁজে পাওয়া শত শত অচেনা পুরুষের কাছে বিক্রি করতে থাকে। এমনকি কোন কোন পুরুষের সাথে সে রাত কাটিয়েছে, তার একটি তালিকা রাখতেও বাধ্য করে।

আদালতের শুনানিতে ল্যাটিটিয়া বলেন, আমি ৪৮৭ জন পুরুষের পর আর গুনতে পারিনি। এদের মধ্যে কয়েকজনের কাছে আমাকে ১০ বার পর্যন্ত যেতে হয়েছিল। বছরের পর বছর চলা এই নির্মম নির্যাতনের ফলে বর্তমানে তিনি গুরুতর শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধকতার শিকার।

মামলার সরকারি আইনজীবীরা বুচ্চির এই অপরাধকে চরম বিপজ্জনক এবং অন্য নারীদের জন্য হুমকি হিসেবে উল্লেখ করে তাঁর যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের দাবি জানিয়েছিলেন। তবে আদালত সব তথ্যপ্রমাণ ও জবানবন্দি বিবেচনা করে গুইলোম বুচ্চিকে ২৫ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করেছে। রায়ে বলা হয়েছে, এই মেয়াদের দুই-তৃতীয়াংশ জেল খাটার আগে সে কোনোভাবেই প্যারোলে মুক্তির আবেদন করতে পারবে না।

ল্যাটিটিয়া জানান, ফ্রান্সের বিখ্যাত ‘জিজেল পেলিকট’ মামলাটি (যেখানে এক স্বামী নিজের স্ত্রীকে ড্রাগ খাইয়ে অজ্ঞান করে শত শত অচেনা পুরুষ এনে ধর্ষণ করিয়েছিল) দেখার পরই তিনি নিজের ওপর হওয়া এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহস পান। পৈশাচিকতা ও মানসিক দাসত্বের এই রোমহর্ষক ঘটনাটি আবারও প্রমাণ করল, ভালোবাসার আড়ালে কত বড় দানব লুকিয়ে থাকতে পারে।