পবিত্র ঈদুল আজহা মুসলমানদের জন্য ত্যাগ ও আনুগত্যের এক মহান ইবাদত। তবে কুরবানিকে ঘিরে অনেক গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা নিয়ে মানুষের মনে প্রশ্ন তৈরি হয়। এর মধ্যে অন্যতম হলো— স্ত্রীর দেনমোহর (মোহরানা) পরিশোধ বাকি থাকলে স্বামী কি কুরবানি দিতে পারবেন? আবার এমন অবস্থায় তার ওপর কুরবানি ওয়াজিব হবে কি না— এ নিয়েও অনেকের মধ্যে দ্বিধা দেখা যায়।
ইসলাম একদিকে যেমন আল্লাহর হক আদায়ের নির্দেশ দিয়েছে, অন্যদিকে বান্দার হক তথা মানুষের অধিকার রক্ষার ব্যাপারেও অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করেছে। তাই দেনমোহর ও কুরবানির সম্পর্ক বুঝতে হলে শরিয়তের দৃষ্টিভঙ্গি জানা জরুরি।
দেনমোহর— স্ত্রীর একটি গুরুত্বপূর্ণ অধিকার
ইসলামে দেনমোহর বা মোহরানা স্ত্রীকে প্রদেয় একটি নির্ধারিত অধিকার। মহান আল্লাহ বলেন—
وَآتُوا النِّسَاءَ صَدُقَاتِهِنَّ نِحْلَةً
‘তোমরা নারীদেরকে তাদের মোহর স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রদান করো।’ (সুরা আন-নিসা: আয়াত ৪)
এই আয়াত থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, দেনমোহর কোনো অনুগ্রহ নয়; বরং এটি স্ত্রীর প্রাপ্য অধিকার।
রাসুলুল্লাহ (সা.)ও দেনমোহর আদায়ের ব্যাপারে গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন—
أَحَقُّ الشُّرُوطِ أَنْ تُوفُوا بِهِ مَا اسْتَحْلَلْتُمْ بِهِ الْفُرُوجَ
‘যে শর্ত পূরণ করা সবচেয়ে বেশি জরুরি, তা হলো যার মাধ্যমে তোমরা স্ত্রীদেরকে হালাল করেছ।’ (বুখারি ৫১৫১, মুসলিম ১৪১৮)
অর্থাৎ, বিবাহের সময় নির্ধারিত মোহর আদায় করা স্বামীর দায়িত্ব।
দেনমোহর ও কুরবানি: ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি
ফিকহবিদদের মতে, দেনমোহর হলো স্ত্রীর হক এবং তা স্বামীর ওপর ঋণ হিসেবে গণ্য হয়। তবে ফিকহের পরিভাষায় এটি সাধারণ ঋণের মতো শক্ত বাধাস্বরূপ নয়; বরং একে বলা হয়— دَيْنٌ ضَعِيفٌ (দাইনে জইফ) অর্থাৎ “দুর্বল ঋণ”।
কারণ এই ঋণ কোনো ব্যবসায়িক লেনদেন বা সম্পদ গ্রহণের বিনিময়ে সৃষ্টি হয়নি; বরং বিবাহচুক্তির মাধ্যমে নির্ধারিত হয়েছে।
সহজ উত্তর হলো— হ্যাঁ, যাবে। স্ত্রীর দেনমোহর বাকি থাকলেও স্বামীর কুরবানি সহিহ হবে। তবে কুরবানি ওয়াজিব হবে কি না, তা নির্ভর করবে তার আর্থিক সামর্থ্যের ওপর।
১. নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকলে
যদি কুরবানির দিনগুলোতে (১০-১২ জিলহজ) দেনমোহর বাকি থাকা সত্ত্বেও স্বামীর কাছে প্রয়োজনের অতিরিক্ত নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকে, তাহলে তার ওপর কুরবানি ওয়াজিব হবে। কারণ তিনি শরিয়তের দৃষ্টিতে সামর্থ্যবান হিসেবে গণ্য হবেন।
২. নিসাব পরিমাণ সম্পদ না থাকলে
যদি দেনমোহরের টাকা পরিশোধ করার পর তার কাছে প্রয়োজনের অতিরিক্ত নিসাব পরিমাণ সম্পদ অবশিষ্ট না থাকে, তাহলে তার ওপর কুরবানি ওয়াজিব হবে না। অর্থাৎ, কুরবানি ওয়াজিব হওয়ার ক্ষেত্রে মূল বিবেচ্য বিষয় হলো— বর্তমান আর্থিক সক্ষমতা।
স্ত্রীর হক আদায়ে ইসলামের গুরুত্ব
ইসলামে মানুষের হক আদায়ের ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
مَطْلُ الْغَنِيِّ ظُلْمٌ
‘সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ঋণ পরিশোধে টালবাহানা করা জুলুম।’ (বুখারি ২৪০০)
তাই দেনমোহর বাকি থাকলেও কুরবানি আদায় হয়ে যাবে ঠিকই, কিন্তু সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও মোহর পরিশোধে অবহেলা করা ঠিক নয়।
ফিকহি দিকনির্দেশনা
হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, দেনমোহরের ঋণ কুরবানি ওয়াজিব হওয়ার পথে সরাসরি বাধা নয়— বিশেষত যখন তা তাৎক্ষণিক আদায়ের দাবি না থাকে।
তবে ইসলামিক স্কলাররা বলেন, একজন মুমিনের উচিত—
> আল্লাহর হক আদায়ের পাশাপাশি বান্দার হকের ব্যাপারেও সচেতন থাকা
> কুরবানির মতো ইবাদতের আগে স্ত্রীর প্রাপ্য অধিকার আদায়ে আন্তরিক হওয়া
> দেনমোহরকে শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিকতা মনে না করা
স্ত্রীর দেনমোহর বাকি থাকলেও কুরবানি দেওয়া জায়েজ এবং কুরবানি সহিহ হবে। তবে কুরবানি ওয়াজিব হবে কি না, তা নির্ভর করবে স্বামীর আর্থিক সামর্থ্যের ওপর। ইসলাম যেমন কুরবানির মতো ইবাদতের গুরুত্ব দিয়েছে, তেমনি স্ত্রীর অধিকার আদায়ের ব্যাপারেও সমান গুরুত্বারোপ করেছে। তাই একজন সচেতন মুসলমানের উচিত আল্লাহর হক ও বান্দার হক— উভয় ক্ষেত্রেই দায়িত্বশীল থাকা।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হালাল উপার্জন, ন্যায়পরায়ণতা ও আন্তরিকতার সঙ্গে ইবাদত পালনের তৌফিক দান করুন। আমিন।
