ভারতের দিল্লি পুলিশ শিশু পাচারকারীদের একটি চক্রকে গ্রেপ্তার করেছে। তারা সুবিধাবঞ্চিত দম্পতিদের কাছ থেকে মাত্র চার-পাঁচ দিন বয়সী নবজাতকদের ‘সংগ্রহ’ করত এবং দেশটির রাজধানীতে এনে নিঃসন্তান দম্পতিদের কাছে কয়েক লাখ টাকায় বিক্রি করে দিত। খবর এনডিটিভির।
এ পাচার চক্রের মধ্যে রয়েছে পাচারকারী, নিঃসন্তান দম্পতি এবং একজন হাসপাতাল মালিক। পাচারকারী চক্রটি কন্যাশিশু তিন থেকে চার লাখ রুপি এবং ছেলে শিশু ছয় থেকে আট রুপিতে বিক্রি করত।
যেভাবে চক্রটি ধরা পড়ল
মধ্য দিল্লির পাহাড়গঞ্জের এক বাসিন্দার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে দিল্লি পুলিশ অভিযান শুরু করে। সেখানে এক নারীকে নিয়মিত বিরতিতে এলাকায় ভিন্ন ভিন্ন শিশুর সঙ্গে দেখা যেত।
পুলিশ ওই এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখে এবং গোয়েন্দা কার্যক্রমও শুরু করে। বেশ কয়েকদিন ধাওয়া করার পর পুলিশ ওই নারীকে শনাক্ত করে এবং তদন্তের কার্যক্রম জোরদার করে। পুলিশের গোয়েন্দা তথ্য থেকে এটা স্পষ্ট হয়ে যায়, জ্যোতি ওরফে কমলেশ নামের ওই নারী শিশু পাচার চক্রের সঙ্গে জড়িত।
ছদ্মবেশে চুক্তি
পুলিশ ছদ্মবেশে একটি চুক্তির অজুহাতে কমলেশের সঙ্গে যোগাযোগ করে। একজন নারী পুলিশ কর্মকর্তা ছদ্মবেশে একটি শিশু কিনতে চান। এরপর কমলেশের সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করা হয় এবং একটি শিশুর জন্য চুক্তি সম্পন্ন হয়। শুরুতে ২০ হাজার রুপি দেওয়ার ব্যাপারে উভয়ের মধ্যে সম্মতি হয়। কমলেশ পুলিশের ছদ্মবেশী কর্মকর্তার কাছে একটি শিশু হস্তান্তর করে। গত ৫ জুন ঘটনাস্থল থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
কমলেশকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ হতবাক হয়ে যায় এবং আরও তদন্ত শুরু করে। তদন্তে ভারতের একাধিক রাজ্যব্যাপী শিশু পাচার চক্রের পর্দা ফাঁস হয়। চক্রটি রাজস্থান ও গুজরাটের দরিদ্র দম্পতিদের কাছ থেকে শিশু কিনে কিংবা চুরি করে মধ্যপ্রদেশ ও হরিয়ানার নিঃসন্তান দম্পতিদের কাছে বিক্রি করত।
জিজ্ঞাসাবাদে কমলেশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পুলিশ তার দুই সহযোগী শালু ও ললিত এবং পরে প্রতিভা ও বিপিনের সন্ধান পায়। তারা শিশু সংগ্রহ ও বিক্রির জন্য চুক্তি করার কাজে জড়িত ছিল।
প্রতিভা ও বিপিনকে গ্রেপ্তারের সময় পুলিশ তাদের কাছে থেকে প্রায় তিন লাখ রুপি জব্দ করেছে। তাদেরকে দুই সপ্তাহ ধরে একটানা জিজ্ঞাসাবাদের পর পুলিশ এক মাসের কম বয়সী পাঁচ শিশুকে উদ্ধার করে।
যে হাসপাতাল ছিল পাচারের কেন্দ্রবিন্দু
গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিদের কয়েকদিন ধরে জিজ্ঞাসাবাদের পর পুলিশ পশ্চিম দিল্লির একটি হাসপাতালের সন্ধান পায়। সেটি হলো রোহিনীর বেগমপুরের হীরা’স মাল্টিস্পেশালিটি হাসপাতাল। এই হাসপাতালটি পুরো চক্রটির মূল কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে এবং এর মালিক ড. বিবেকী হলেন মূল হোতা।
পুলিশের ডিসিপি রোহিত রাজবীর সিং বলেন, পাচারকারীরা নিঃসন্তান দম্পতিদের কাছে শিশুদের পৌঁছে দেওয়ার আগ পর্যন্ত তাদের ডা. বিবেকীর হাসপাতালে রাখত।
রাজবীর সিং আরও বলেন, ডা. বিবেকী এই পুরো চক্রের মূল হোতা। তিনি শিশুদের সম্পর্কিত বিভিন্ন নথি জাল করতে সাহায্য করেছেন। জন্ম সনদ, প্রসবের কাগজপত্র, চালানপত্র—সবকিছুই তার হাসপাতালে জাল করা হয়েছিল, যাতে মনে হয় শিশুরা এখানেই জন্মগ্রহণ করেছে।
নবজাতকের দর
পুলিশের তদন্তে দেখা গেছে, প্রায় এক লাখ রুপিতে একটি কন্যাশিশু সংগ্রহ করে প্রায় তিন থেকে চার লাখ রুপি বিক্রি করা হচ্ছিল। তবে একজন ছেলেশিশু প্রায় দুই লাখ রুপিতে কিনে ছয় থেকে আট লাখ রুপিতে বিক্রি করছিল চক্রটি।
ডিসিপি রাজবীর সিং বলেন, এই অর্থ লেনদেন ডা. বিবেকীর হাসপাতালেই সম্পন্ন হতো। ডা. বিবেকী শিশু কিনতে ইচ্ছুক দম্পতি ও পাচারকারীদের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করতেন।
হেফাজতে থাকা ব্যক্তিদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ গুজরাটের সবরকান্থা থেকে সাবভাই ঘামার ওরফে কালিয়া নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে। পুলিশ জানায়, মূলত উদয়পুরের বাসিন্দা সাবভাই ঘামার, রাজস্থানের পালি ও সবরকান্থার সুবিধাবঞ্চিত দম্পতিদের কাছ থেকে শিশুদের ‘কিনতেন’ এবং দিল্লির ডা. বিবেকীর হাসপাতালের মাধ্যমে নিঃসন্তান দম্পতিদের কাছে তাদের বিক্রি করতেন।
এদিকে, উদ্ধার হওয়া শিশুগুলোর আসল বাবা-মায়ের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে পুলিশ। এ শিশুগুলোর বাবা-মা স্বেচ্ছায় তাদের বিক্রি করেছে নাকি জোর করা হয়েছে, অথবা শিশুগুলো চুরি করা হয়েছে কিনা জানার চেষ্টা করছে পুলিশ। ডিসিপি রাজবীর সিং বলেন, পরিবারগুলো যদি নিজেদের ইচ্ছায় পাচারকারীদের কাছে শিশুদের বিক্রি করে থাকে, তবে তাদেরকেও অভিযুক্ত করা হবে।
তদন্তে জানা গেছে, সাবভাই ঘামার ও তার দল গত এক বছরে অন্তত ৩০টি শিশু পাচার করেছে। এই শিশুদের মধ্যপ্রদেশ ও হরিয়ানার দম্পতিদের কাছে বিক্রি করা হয়েছিল। পুলিশ হরিয়ানার পানিপত থেকে সানি অরোরা ও ঋতু অরোরা নামে এক দম্পতিকে গ্রেপ্তার করেছে। এই দলটির কাছ থেকে একটি শিশু কেনার অভিযোগে মধ্যপ্রদেশের গোয়ালিয়রের আরও এক দম্পতিকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ বলছে, এই পরিবারগুলোকেও এই মামলায় অভিযুক্ত করা হবে।
৯ লাখ রুপিতে ‘যমজ’ শিশু বিক্রি
ডিসিপি রাজবীর সিং জানান, পাচারকারী চক্রটি শিশু কিনতে চাওয়া এক দম্পতির সঙ্গে প্রতারণা করেছে। তারা একটি ছেলে সন্তান চেয়েছিল। তবে সেই মুহূর্তে চক্রটির কাছে একটি ‘অতিরিক্ত’ মেয়েশিশু ছিল, তারা দ্রুত বিক্রি করে দিতে ওই দম্পতিকে একটি মেয়ে ও একটি ছেলে শিশুকে যমজ হিসেবে পরিচয় করিয়ে নয় লাখ রুপি দাবি করে। শিশু দুটি যমজ ছিল না এবং তাদের ভিন্ন ভিন্ন জায়গা থেকে আনা হয়েছিল।
পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে কমলেশ ও প্রতিভার বিরুদ্ধে আগেও পাচার মামলা হয়েছে। হীরা’স মাল্টিস্পেশালিটি হাসপাতাল এবং আরও কয়েকটি ল্যাবে টেকনিশিয়ান হিসেবেও কাজ করত প্রতিভা। পুলিশের মতে, সে-ই ছিল ডা. বিবেকীর হাসপাতাল এবং পাচারকারী চক্রের মধ্যে সংযোগকারী।
গ্রেপ্তারকৃত আরেকজন হলেন ওমবতী। তিনি গুরুগ্রামে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতেন এবং শিশু ‘সংগ্রহ’ নেটওয়ার্কের অংশ ছিলেন।
ডিসিপি রাজবীর সিং এই চক্রটি ধরার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য বিশেষভাবে তিনজন নারী পুলিশ সদস্যের নাম উল্লেখ করেছেন, তারা হলেন সাব-ইন্সপেক্টর প্রগতি ও যামিনী ও হেড কনস্টেবল সুষমা।
উদ্ধারকৃত শিশু
পাঁচটি উদ্ধারকৃত শিশুকে শিশু কল্যাণ কমিটিতে পাঠানো হয়েছে এবং বর্তমানে তাদের পালনা কেন্দ্রে যত্ন নেওয়া হচ্ছে। শিশু কল্যাণ কমিটি যত্ন ও সুরক্ষার প্রয়োজন রয়েছে এমন শিশুদের জন্য একমাত্র উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ হিসেবে কাজ করে। তারা উদ্ধারকৃত শিশুদের গ্রহণ করে এবং তাৎক্ষণিক আশ্রয় নিশ্চিত করে। কমিটি শিশুদের বিশেষায়িত দত্তক সংস্থা, শিশু সদনে স্থানান্তরের নির্দেশনা দেয়, অথবা তাদের আইনত দত্তকের জন্য হস্তান্তর করে।
