ব্যবধান মাত্র কয়েক মিনিট; এতেই খুন ৩ জন। এরপর দিনশেষে মৃত্যু হয় আরও এক মেয়ের। দেশজুড়ে আলোচিত লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন মা ও তিন মেয়ে। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে গুরুতর আহত হওয়ার পর একে একে মৃত্যু হয় তাদের। এ ঘটনায় অভিযুক্ত অন্তর মজুমদারকে আটক করে গণপিটুনি দিলে তারও মৃত্যু হয়। বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) সকাল সোয়া ১১টার দিকে রায়পুর পৌরসভার গোডাউন রোড এলাকার একটি ভাড়া বাসায় এ ঘটনা ঘটে।
নিহতরা হলেন- শাহিনুর বেগম (৩৮), তার বড় মেয়ে ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিচ্ছু সায়মা আক্তার (২১), মেজো মেয়ে ইকরা আক্তার (১৭) এবং ছোট মেয়ে শিফা আক্তার (৯)। গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার বাসিন্দা অন্তর মজুমদার।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার সকালে ঘাতক অন্তর মজুমদার ধারালো অস্ত্র নিয়ে শাহিনুর বেগমের বাসায় প্রবেশ করেন। বাড়ির মালিক ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলে লক্ষ্মীপুরের পুলিশ সুপার মো. আবু তারেক জানিয়েছেন, অন্তর তার স্ত্রীকে নিয়ে প্রায় দেড় বছর ওই এলাকায় ভাড়া থাকতেন। প্রায় সাত থেকে আট মাস আগে তিনি বাসা ছেড়ে চলে যান। পূর্বপরিচয়ের সূত্রে সেদিন সকালে তিনি ওই বাসায় আসেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রতিবেশী রাণী নামে এক নারী অন্তরকে বাসার সামনে দেখে তার আসার কারণ জানতে চান। তখন অন্তর জানান, তিনি পানির পাইপ মেরামত করতে এসেছেন। তবে তার কথায় সন্দেহ হওয়ায় রাণী কলাপসিবল গেট আটকে দিয়ে স্থানীয়দের খবর দেন। এর কিছুক্ষণ পরই ঘরের ভেতরে শুরু হয় ভয়াবহ হামলা। পুলিশ জানিয়েছে, সকাল পৌনে ১১টা থেকে সোয়া ১১টার মধ্যে অন্তর ধারালো অস্ত্র দিয়ে শাহিনুর বেগম ও তার তিন মেয়ের ওপর এলোপাতাড়ি হামলা চালান।
দুপুরের দিকে ঘরের ভেতর থেকে চিৎকার শুনে প্রতিবেশীরা ছুটে আসেন। তারা ঘরে ঢুকে শাহিনুর বেগম ও তার মেয়েদের রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। পরে দ্রুত তাদের উদ্ধার করে রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়।
প্রতিবেশী জনৈক মহিলা বলেন, চিৎকার শুনে আমি তাদের বাসার সামনে গিয়ে ডাকাডাকি করলে চিৎকার থেমে যায় এবং কোন জবাব পাইনি। পরে জানালা দিয়ে এক ব্যক্তিকে কিচেন রুমের দিকে যেতে দেখি। প্রথমে ভাবছিলাম তাদের কোন আত্মীয় হবে। হয়তো কোন বিষয় নিয়ে ঝগড়া করছে। লোকটিকে বাসার গেইটে দেখে আমি তার পরিচয় জানতে চাইলে সে জানায় বাথরুমের টেপ মেরামত করতে এসেছে। একথা বলে দরজা বন্ধ করে দিলে আমার সন্ধেহ হয় যে, হয়তো সে ওই বাসার কোন ধর্ষণ করেছে। কারণ, তখন সম্ভবত সে উলঙ্গ ছিলো, আমি ভালো করে দেখতে পাইনি। এরপর আমি চিৎকার করে সবাইকে ডাকলে সে ছাদের দিকে উঠে পালিয়ে যেতে চায়। পরবর্তীতে লোকজন এসে ভিতরে ঢুকে ফ্লোরে রক্ত ও চারজনের দেহ রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে পুলিশকে ফোন দেয়।
রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. মামুনুর রশিদ জানান, শাহিনুর বেগম ও ছোট মেয়ে শিফার হাসপাতালে নেওয়ার আগেই মৃত্যু হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে আনার পর মারা যান সায়মা আক্তার। আর ইকরাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়ার পথে কুমিল্লায় তার মৃত্যু হয়।
এদিকে হামলার পর অন্তর মজুমদার ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। স্থানীয় বাসিন্দারা তাকে আটক করে গণপিটুনি দেন। পরে পুলিশ আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানেই তার মৃত্যু হয়।
জানা গেছে, নিহত পরিবারটির বাড়ি কুমিল্লা জেলায়। তারা দীর্ঘদিন ধরে রায়পুর পৌর শহরের ভাড়া বাসায় বসবাস করছিলেন। কয়েক বছর আগে পরিবারের কর্তা কামাল হোসেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান। এরপর শাহিনুর বেগম তিন মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে সংসার চালিয়ে আসছিলেন।
নিহত সায়মা আক্তার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। ইকরা আক্তার রায়পুর কাজী ফারুকী কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী এবং শিফা আক্তার চতুর্থ শ্রেণিতে পড়াশোনা করত।
লক্ষ্মীপুরের পুলিশ সুপার মো. আবু তারেক বলেন, স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী অন্তর মজুমদার ওই বাসায় নিয়মিত যাতায়াত করতেন। তবে কী কারণে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ। ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তদন্ত চলছে। ঘটনায় অভিযুক্তকে স্থানীয়রা হাতেনাতে ধরে গণপিটুনি দেয়। পরে পুলিশ এসে উদ্ধার করে সদর হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য পাঠায়। এই ব্যাপারে আমরা বিস্তারিত তদন্ত করে দ্রুতই ব্যবস্থা নেব এবং আপনাদেরকে জানাব।
