সেই ১৪ জুলাই: ‘রাজাকার’ বলার দিনেই ‘মুরগিতে’ উত্তাল দেশ

আজ সেই ১৪ জুলাই! বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাসে এ তারিখটি এক অদ্ভুত এবং নাটকীয় সমাপতনের জন্ম দিয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই মাসের এই দিনে এক সংবাদ সম্মেলনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্দোলনকারীদের ইঙ্গিত করে ‘রাজাকারের নাতি-পুতি’ মন্তব্য করেন।

সাংবাদিক প্রভাস আমিনের প্রশ্নের জবাবে দেওয়া সেই বক্তব্যই কোটা সংস্কার আন্দোলনকে মুহূর্তের মধ্যে সরকার পতনের একদফা দাবিতে রূপ দেয়। ঠিক দুই বছর পর এই মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) শিক্ষামন্ত্রীর ‘ফার্মের মুরগি’ বিষয়ক মন্তব্যে দিনভর আন্দোলন হলো সারা দেশে।

শিক্ষার্থীদের এই স্লোগানের সূত্র একটি অডিও-ভিডিও, যা সোমবার রাত থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। জানা গেছে, গত রোববার ভিডিওতে এক পরীক্ষার্থীর সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলতে শোনা যায় শিক্ষামন্ত্রীকে।

সেখানে তিনি বলেন, ‘ওরা তো ফার্মের মুরগি, একটু বৃষ্টিতে ভিজলেই জ্বর চলে আসবে। আমার মেয়ের মতে।’ এই মন্তব্যকে শিক্ষার্থীরা অবমাননাকর দাবি করে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এরপর থেকেই আন্দোলনে ‘ফার্মের মুরগি’ স্লোগানটি ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

ভাইরাল অডিওর জন্য সংসদে শিক্ষামন্ত্রীর দুঃখ প্রকাশ

উল্লেখ্য, চীন সফর থেকে ফিরে ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেখানে কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে প্রভাস আমিনের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে এত ক্ষোভ কেন? মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-পুতিরাও পাবে না? তাহলে কি রাজাকারের নাতি-পুতিরা পাবে?’

তার এই বক্তব্যের জেরে মধ্যরাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে আসেন এবং ‘তুমি কে আমি কে, রাজাকার রাজাকার’ স্লোগানের মাধ্যমে তীব্র প্রতিবাদ জানান। পরে এ আন্দোলন শিক্ষার্থীদের সরকার পতনের বৃহত্তর আন্দোলনে রূপ নেয়।

এদিকে সম্প্রতি ‘ফার্মের মুরগি’ বিতর্কের সূত্রপাত টানা ভারী বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার মধ্যেও এইচএসসি পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তকে ঘিরে। এ নিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সমালোচনার মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের একটি ফোনালাপের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। রাজধানীর সিটি কলেজের এক পরীক্ষার্থীর অভিভাবক হোয়াটসঅ্যাপে মন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার সময় সেই আলাপ অন্য একটি মোবাইল ফোনে ধারণ করা হয়।

ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে পরীক্ষার্থীদের শারীরিক অবস্থা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মন্ত্রীকে বলতে শোনা যায়, ‘এরা তো ফার্মের মুরগি, এগুলো তো মাথায় বৃষ্টি পড়লেই জ্বর আসে। আমার মেয়ের তাই হয়। একদিন বৃষ্টিতে ভিজবে জ্বর আসবে, তখন পরের তিন দিন তো আর পরীক্ষা দিতে পারবে না এরা।’

ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর ‘ফার্মের মুরগি’ মন্তব্যকে অপমানজনক উল্লেখ করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। মঙ্গলবার সকাল থেকেই রাজধানীর সায়েন্সল্যাব, শাহবাগ, উত্তরাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করেন। আন্দোলনে ‘আমি কে, তুমি কে, ফার্মের মুরগি’ স্লোগানের পাশাপাশি শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিও ওঠে। পরে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, রংপুর ও বরিশালসহ বিভিন্ন স্থানেও একই দাবিতে কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।

এমন পরিস্থিতিতে জাতীয় সংসদে নিজের মন্তব্য নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেছেন শিক্ষামন্ত্রী। মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে অংশ নিয়ে এ দুঃখ প্রকাশ করেন তিনি।

শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘আমার ব্যক্তিগত মন্তব্য নিয়ে অনেকেই আপত্তি জানিয়েছেন। আমি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কাউকে কিছু বলিনি। তার পরও আমার বক্তব্যে কেউ যদি আহত হয়ে থাকেন, সেজন্য আমি দুঃখ প্রকাশ করছি।’ মন্ত্রীর এ বক্তব্যের পর উপস্থিত সংসদ সদস্যরা টেবিল চাপড়ে তার দুঃখ প্রকাশকে স্বাগত জানান।

এর আগে বিকালে সংসদে স্পিকারের মাধ্যমে সম্পূরক প্রশ্ন উত্থাপন করে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেন, এইচএসসির মতো একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা, যেটার ওপর আগামীতে একজন ছেলে বা মেয়ের ভবিষ্যৎ কোন দিকে যাবে, তা নির্ভর করে। আর পদার্থবিজ্ঞানের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি পরীক্ষার ক্ষেত্রে কেন এক দিন বা দুদিনের জন্য পিছিয়ে দেওয়া গেল না, তা মন্ত্রীর কাছে জানতে চান তিনি।

রুমিন ফারহানার প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী জানান, সারা দেশে এইচএসসি পরীক্ষায় প্রায় ২ হাজার ৭০০টি কেন্দ্রে একযোগে পরীক্ষা শুরু হয়। চট্টগ্রামে বন্যার কারণে এরই মধ্যে রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়িসহ পুরো চট্টগ্রাম বোর্ডের পরীক্ষা আগেই স্থগিত করা হয়েছিল। চলমান পরিস্থিতির ওপর সরকার সার্বক্ষণিক মনিটরিং করছিল এবং ৬৪ জেলার এসপি, আটটি বিভাগীয় কমিশনার, প্রতিটি বোর্ডের চেয়ারম্যান ও ইউএনওদের সঙ্গে কথা বলা হয়েছিল। এমনকি আবহাওয়ার পূর্বাভাসের জন্য সংশ্লিষ্টদের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখা হয়। তারা সবাই পরিস্থিতি অনুকূলে থাকবে বলে জানানোর পর, বিকেল ৫টা পর্যন্ত অপেক্ষা করে পরীক্ষা যথাসময়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

প্রসঙ্গত, গতকাল ১৩ জুলাই দেশজুড়ে ভারী বৃষ্টিপাতের মধ্যেই অনুষ্ঠিত হয়েছে এইচএসসি পরীক্ষা। এর আগের কয়েকদিনের ভারী বর্ষণে কুমিল্লা, নোয়াখালী, বগুড়াসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। ফলে পরীক্ষার দিন শিক্ষার্থীরা কোমরসমান পানি মাড়িয়ে এবং নৌকায় চড়ে কেন্দ্রে যান, যার ভিডিও ও ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি। এরই পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষামন্ত্রীর বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামে।