৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট বাতিল হলে কী হবে অর্থনীতিতে!

আপনার পকেটে থাকা ৫০০ কিংবা ১০০০ টাকার নোটটি যদি আজ হঠাৎ বাতিল হয়ে যায়, তবে কী হতে পারে ভেবে দেখেছেন? সম্প্রতি জাতীয় সংসদের অধিবেশনে ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট বাতিলের প্রস্তাব করেন সরকারি দলের সংসদ সদস্য মাহবুব উদ্দিন খোকন। এরপরই জনমনে প্রশ্ন জেগেছে—সত্যিই কি বাতিল হচ্ছে এই দুই বড় নোট? এটি কি সাধারণ মানুষের জন্য বড় ধাক্কা, নাকি কালো টাকার মালিকদের দমনে নতুন কোনো কৌশল? যদি সত্যি এই নোট দুটি বাতিল করা হয়, তবে সাধারণ মানুষের জীবন এবং দেশের অর্থনীতির ওপর ঠিক কী প্রভাব পড়বে?

সংসদে ঠিক কী বলা হয়েছে?
ঘটনার সূত্রপাত চলতি অর্থবছরের বাজেট অধিবেশনে। সংসদে দাঁড়িয়ে বিএনপি সমর্থিত ও বর্তমানে সরকারি দলের সংসদ সদস্য মাহবুব উদ্দিন খোকন অর্থমন্ত্রীর কাছে একটি প্রস্তাব করেন। তিনি দাবি করেন, মানুষের কাছে প্রচুর নগদ টাকা থাকলেও ব্যাংকের ওপর আস্থা না থাকায় তাঁরা টাকা ঘরে জমিয়ে রাখছেন। বিশেষ করে বিদায়ী সরকারের লোকজন ঘরে ঘরে কোটি কোটি নগদ টাকা ফেলে রেখে গেছেন। এই অলস অর্থ ব্যাংকিং চ্যানেলে ফিরিয়ে আনতে তিনি সরাসরি ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট পুরোপুরি বাতিল করার প্রস্তাব দেন। একই সঙ্গে এই পুরোনো নোট ব্যাংকে জমা দেওয়ার জন্য দুই মাসের সময় বেঁধে দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তাঁর দাবি, এতে রাতারাতি আড়াই লাখ কোটি টাকার মতো বিশাল অঙ্কের অলস অর্থ বৈধ হয়ে ব্যাংকে ফিরবে, যা দেশের বাজেট ঘাটতি পূরণ করবে এবং অর্থনীতির চাকা ঘুরিয়ে দেবে।

কখন একটি দেশে নোট বাতিল হয়?
সংসদের এই প্রস্তাবের পর সাধারণ মানুষের মনে কিছুটা উদ্বেগ ছড়ালেও অর্থনীতির ইতিহাস বলছে, নোট বাতিল একদম নতুন কিছু নয়। বিশ্বের বহু দেশে বিভিন্ন সময়ে বড় নোট বাতিল করা হয়েছে। এমনকি বাংলাদেশেও ১৯৭৩ সালে জাল টাকার দৌরাত্ম্য থামাতে জলছাপ ছাড়া কিছু নোট বাতিল করা হয়েছিল। তবে প্রশ্ন হলো, একটি সরকার কেন নিজের দেশের সচল মুদ্রা বাতিল করতে যায়? অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এর প্রধান কারণ তিনটি:

প্রথমত: কালো টাকার জোগান বন্ধ করা। দুর্নীতি বা কর ফাঁকি দিয়ে মানুষ যে কোটি কোটি টাকা ঘরে লুকিয়ে রাখে, নোট বাতিল হলে সেগুলো বাধ্য হয়ে ব্যাংকে আনতে হয়। না আনলে সেই টাকা স্রেফ কাগজে পরিণত হয়।

দ্বিতীয়ত: জাল নোটের নেটওয়ার্ক ধ্বংস করা।

তৃতীয়ত: সন্ত্রাসী অর্থায়ন বা অপরাধ চক্রের সিন্ডিকেট উপড়ে ফেলা।

শুনতে মনে হতে পারে এটি একটি চমৎকার আইডিয়া। এক সিদ্ধান্তেই সব অপরাধ আর কালো টাকা শেষ! কিন্তু অর্থনীতির একটি চিরন্তন নিয়ম আছে—‘দেয়ার ইজ নো ফ্রি লাঞ্চ’ অর্থাৎ বিনা মূল্যে কিছুই মেলে না। এক জায়গায় লাভ হলে অন্য জায়গায় যে কত বড় বিপদ লুকিয়ে থাকে, তা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ।

নোট বাতিলের আসল ঝুঁকি
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিক্ষক ড. মুস্তফা কে মুজেরি এবং উন্নয়ন অন্বেষণের মতো গবেষণা প্রতিষ্ঠানের অর্থনীতিবিদ ড. মাহফুজ কবীরের মতো বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নোট বাতিলের সিদ্ধান্তে লাভের চেয়ে উল্টো বড় ধরনের অর্থনৈতিক বিপর্যয় তৈরি হতে পারে।

আস্থার সংকট ও চরম আতঙ্ক: যেই মুহূর্তে সরকার নোট বাতিলের ঘোষণা দেবে, অমনি দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে হাহাকার পড়ে যেতে পারে। প্রত্যেকে নিজের কষ্টার্জিত টাকা বাঁচাতে কাজকর্ম ফেলে ব্যাংকের দিকে ছুটবেন। বাজারে নগদ টাকার তীব্র সংকট দেখা দেবে এবং থমকে যাবে ছোট-বড় সব ব্যবসা-বাণিজ্য।

ডলার ও স্বর্ণের বাজারে অস্থিরতা: দেশের টাকার ওপর থেকে মানুষের আস্থা উঠে গেলে মানুষ তখন নিজের সম্পদ বাঁচাতে ডলার, স্বর্ণ কিংবা স্থাবর সম্পত্তির ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়বে। ফলে হু হু করে বাড়বে ডলারের দাম, যা দেশের মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে।

নতুন নোট ছাপানোর আকাশচুম্বী খরচ: পুরোনো নোট বাতিল করলে বাজার সচল রাখতে নতুন নোট ছাপাতে হবে। এই নতুন নোট ছাপাতে গিয়ে সরকারের রাজকোষ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা স্রেফ খরচ হয়ে যাবে, যা হিতে বিপরীত হতে পারে। ১৯৮৪ সালে নাইজেরিয়া ঠিক এই ভুলটিই করেছিল এবং দেশটিতে মূল্যস্ফীতি মহাবিপদ সংকেত ছুঁয়েছিল।

নোট বাতিলের সবচেয়ে বড় এবং প্রত্যক্ষ উদাহরণ দেখতে আমাদের বেশি দূরে যেতে হবে না, প্রতিবেশী দেশ ভারতেই তা ঘটেছে। ২০১৬ সালে নরেন্দ্র মোদি সরকার রাতারাতি ৫০০ ও ১০০০ রুপির নোট বাতিল করে দেয়। দেশের ৮৬ শতাংশ নগদ অর্থ এক ঝটকায় অবৈধ হয়ে যায়। এর ফলে ভারতের অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা লেগেছিল। কাঁচাবাজার থমকে গিয়েছিল, এটিএমের লাইনে দাঁড়িয়ে মানুষের ভোগান্তির শেষ ছিল না। পরিস্থিতি সামলাতে দেশটির বিমানবাহিনী দিয়ে নোট ভারতের নানা প্রান্তে পৌঁছাতে হয়েছিল।

সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, ভারত সরকার ভেবেছিল কালো টাকার মালিকেরা ভয়ে টাকা ব্যাংকে আনবেন না, ফলে কালো টাকা ধ্বংস হবে। কিন্তু ভারতের রিজার্ভ ব্যাংকের (আরবিআই) তথ্য বলছে, বাতিল হওয়া নোটের প্রায় ৯৯ শতাংশই কোনো না কোনো উপায়ে ব্যাংকে জমা পড়েছে। অর্থাৎ কালো টাকার মালিকেরা ঠিকই তাঁদের টাকা সাদা করে ফেলেছেন। উল্টো নতুন নোট ছাপাতে ও ব্যাংকগুলোকে সুদ দিতে গিয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত লোকসান হয়েছিল। ভারতের এই অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে—নোট বাতিল আসলে কোনো জাদুকরি সমাধান নয়।

সংসদে ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট বাতিলের প্রস্তাব এসেছে ঠিকই, তবে বাংলাদেশ সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে এই বিষয়ে কোনো ধরনের সিদ্ধান্ত বা ঘোষণা দেওয়া হয়নি। অর্থাৎ আপনার পকেটে থাকা ৫০০ কিংবা ১০০০ টাকার নোট আগের মতোই শতভাগ সচল এবং নিরাপদ রয়েছে। এখানে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। অর্থনীতিবিদদের মতে, কালো টাকা বন্ধ করতে হলে নোট বাতিল নয়, বরং কর ফাঁকি রোধ করা এবং ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম শক্ত হাতে দমন করাই একমাত্র স্থায়ী সমাধান