সিলেট নগরের মিতালী আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসায় আলোচিত ট্রিপল মার্ডারের ব্যবহৃত ছোরা উদ্ধার করেছে পুলিশ। আটক আসামি বাবুল মিয়ার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার সকালে রায়নগরের একটি খালি প্লটে তল্লাশি চালিয়ে ছোরাটি উদ্ধার করা হয়। একইসঙ্গে তিন জনকে হত্যার কারণ পুলিশকে জানিয়েছে বাবুল।
উদ্ধার করা ছোরাটি ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হবে। ছোরায় থাকা রক্তের নমুনার সঙ্গে ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা রক্তের নমুনা মিলিয়ে দেখা হবে। এর মাধ্যমে ছোরায় থাকা রক্ত কার, তা নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করা হবে।
৩ জনকে একাই হত্যা, বাসার সিসি ক্যামেরায় ‘খুনিকে’ যা করতে দেখা গেলো৩ জনকে একাই হত্যা, বাসার সিসি ক্যামেরায় ‘খুনিকে’ যা করতে দেখা গেলো
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) উপ-পুলিশ কমিশনার (উত্তর ও প্রসিকিউশন) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও আলামত উদ্ধারের বিষয়ে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান।
তিনি জানান, হত্যাকাণ্ডের পর বাবুল মিয়া রায়নগরের একটি খালি জায়গায় ছোরাটি ফেলে দেয় বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে। বুধবার সন্ধ্যায় ওই এলাকায় তল্লাশি চালিয়েও ছোরাটি পাওয়া যায়নি। পরে বৃহস্পতিবার সকালে শ্রমিক নিয়ে আবারও তল্লাশি চালালে ছোরাটি উদ্ধার করা হয়।
এর আগে বুধবার সকালে নগরীর রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসার দোতলায় এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। বাসার ভেতরে ঢুকে স্বামী-স্ত্রী ও গৃহপরিচারিকাকে কুপিয়ে এবং গলা কেটে হত্যা করা হয়। নিহতরা হলেন– ওই এলাকার বাসিন্দা আব্দুস সাত্তার (৮২), তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭২) ও গৃহপরিচারিকা তাহমিনা আক্তার (২০)। গৃহকর্মী তাহমিনা নগরীরর জল্লারপাড়া এলাকার বাসিন্দা আফতাব মিয়ার মেয়ে।
৩ জনকে একাই খুন করেছেন কাজের মেয়ের প্রেমিক, বলছে পুলিশ৩ জনকে একাই খুন করেছেন কাজের মেয়ের প্রেমিক, বলছে পুলিশ
উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল মিয়া যে ধরনের ছোরার কথা বলেছিল, উদ্ধার করা ছোরাটির সঙ্গে তার মিল রয়েছে। বাবুল মিয়া রঙমিস্ত্রির পাশাপাশি কসাইয়ের কাজ করেন। আটকের পর সে পুলিশকে জানিয়েছিল, ছোরাটি ছয় থেকে সাত ইঞ্চি লম্বা এবং কাঠের হাতলযুক্ত হতে পারে। উদ্ধার করা ছোরাটির সঙ্গে এ বর্ণনার যথেষ্ট মিল পাওয়া গেছে। তবে ফরেনসিক পরীক্ষা ও অন্যান্য সাক্ষ্য-প্রমাণের মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত করা হবে।
মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম আরও জানান, ঘটনাস্থলের আলামত বিশ্লেষণ করে হত্যাকাণ্ডের পর ছোরাটি ধুয়ে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে পুলিশ। বাসার বেসিন ও হাত ধোয়ার স্থানে রক্তের চিহ্ন পাওয়া গেছে। ছোরার ধাতব অংশেও শুকনো রক্তের দাগ রয়েছে। একটি ব্যাগেও রক্তের দাগ পাওয়া গেছে।
হত্যাকাণ্ডের পেছনে প্রেমের সম্পর্ক নাকি সম্পত্তি সংক্রান্ত বিরোধ ছিল– এমন প্রশ্নের জবাবে পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল মিয়া জানিয়েছেন, রং করার কাজ করতে গিয়ে নিহত গৃহকর্মীর সঙ্গে তার পরিচয় ও যোগাযোগ হয়। তাদের সম্পর্ক প্রেমের পর্যায়ে গিয়েছিল কিনা, সেটি জানায়নি বাবুল। এর মধ্যে গৃহকর্মীর কোনও আচরণে বাবুল ক্ষুব্ধ হয়েছিল বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছ। ওই ক্ষোভ থেকেই গৃহকর্মীকে হত্যা করতে তিনি ছুরি নিয়ে বাসায় গিয়েছিল।
ঘরে ঢুকে ৩ জনকে খুন, লোডশেডিংয়ের কারণে ধরা পড়েনি সিসি ক্যামেরায়ঘরে ঢুকে ৩ জনকে খুন, লোডশেডিংয়ের কারণে ধরা পড়েনি সিসি ক্যামেরায়
জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে পুলিশ কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম জানান, প্রথমে গৃহকর্মীকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। তাকে রক্ষা করতে গৃহকর্ত্রী এগিয়ে এলে তার সঙ্গে বাবুল মিয়ার ধস্তাধস্তি হয়। পরে গৃহকর্তা এগিয়ে এলে তাকেও ছুরিকাঘাত করা হয়। এরপর বারান্দা দিয়ে পালিয়ে যায় বাবুল মিয়া।
তিনি আরও জানান, ঘটনাস্থল পরিদর্শনে পুলিশ বাসায় প্রবেশের সময় দরজার নিচের ছোট ছিটকানি ভাঙা অবস্থায় পেয়েছে। বাবুল মিয়া যে বারান্দা দিয়ে পালানোর কথা জানিয়েছে, সেখানকার রেলিংয়ে হাতের ছাপ ও পায়ের ছাপ পাওয়া গেছে। নিচেও রক্তের চিহ্ন মিলেছে। তবে বাবুল মিয়া ছাড়া অন্য কেউ ওই বাসায় প্রবেশ করেছিল কি না, সে বিষয়ে এখনও কোনও তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ।
হত্যাকাণ্ডের পর বাসার কয়েকটি ওয়ারড্রোব ও আলমারি খোলা অবস্থায় পাওয়া গেলেও সেগুলো ভাঙা ছিল না। সেখান থেকে কোনও মূল্যবান জিনিস খোয়া গেছে কি না, তা এখনও নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ।
এদিকে ঘটনাস্থল থেকে তিন পাতার একটি দলিলসদৃশ কাগজ উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশ বলছে, এটি মূল দলিল নয়; সম্ভবত ফটোকপি বা অনুলিপি। এর সঙ্গে কোনও মামলা বা সম্পত্তিসংক্রান্ত বিরোধের যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
পুলিশ আরও জানায়, বাবুল মিয়া আগে ওই বাসায় রঙ করার কাজ করায় ঘরের ভেতরের পরিবেশ ও বিভিন্ন জিনিসপত্র সম্পর্কে তার ধারণা ছিল। সে দীর্ঘদিন বাসাভাড়া পরিশোধ করতে পারছিল না বলেও পুলিশ জানতে পেরেছে। হত্যাকাণ্ডের পর সে বাসাভাড়া পরিশোধ করেছে কি না এবং ঘটনার পর কোথায় কোথায় গিয়েছিল, সেসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
মামলার বিষয়ে মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, নিহত দম্পতির প্রবাসী সন্তানদের একজন বা একাধিকজন দেশে এসে আইনজীবী ও স্বজনদের মাধ্যমে এজাহার দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এজাহার পাওয়া গেলে সেটি মামলা হিসেবে রেকর্ড করা হবে এবং আটক বাবুল মিয়াকে আদালতে হাজির করা হবে।
উল্লেখ্য, বুধবার দুপুরে পুলিশ সাংবাদিক জানিয়েছিল, সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ১০টা পর্যন্ত ওই এলাকায় লোডশেডিং ছিল। তখনই হত্যাকাণ্ড ঘটে। নিহতদের বাসা ও পুরো এলাকা সিসি ক্যামেরার আওতায় থাকলেও লোডশেডিংয়ের কারণে কোনও ফুটেজ ধরা পড়েনি খুনি। এমনকি বাসার সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজেও কাউকে দেখা যায়নি। তবে পাশের এলাকার যে গলি দিয়ে খুনি পালিয়ে গিয়েছিল, সেখানের সিসিটিভির ফুটেজ দেখে তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় বাবুলকে শনাক্ত করে আটক করে পুলিশ।
পরে বুধবার রাতে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) উপকমিশনার (উত্তর) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, মূলত বাসার সিসিটিভির ফুটেজ দেখেই খুনিকে শনাক্ত করতে পেরেছে পুলিশ। তখন বাসার সিসিটিভির ফুটেজের কথা গোপন রাখা হয়েছিল, কারণ এতে করে খুনি এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যেতো। বাসার তিনটি কক্ষে তিনটি সিসিটিভি ক্যামেরা ছিল। এর মধ্যে একটির সিসিটিভির ক্যামেরা অকেজো করে দিয়েছিল খুনি। বাকি দুটির ফুটেজ দেখে তাকে শনাক্ত করা হয়েছে। ওই ফুটেজের সূত্র ধরেই ৬ ঘণ্টার মধ্যে বাবুল মিয়াকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় পুলিশ।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আব্দুস সাত্তার দম্পতি মিতালী আবাসিক এলাকার বাসিন্দা। পেশায় ব্যবসায়ী হলেও আওয়ামী লীগের একজন পুরোনো কর্মী হিসেবে মহল্লায় পরিচিত। তবে বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার পর তিনি নিষ্ক্রিয় ছিলেন। এক ছেলে ও এক মেয়ে তাদের। দুই জনই সপরিবারে লন্ডনে থাকেন। মিতালী আবাসিক এলাকা পুরোটা সিসি ক্যামেরা দিয়ে নিয়ন্ত্রিত। তাদের বাসায়ও ছিল নিজস্ব সিসি ক্যামেরা। সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ১০টার মধ্যে ঘটনাটি ঘটে।

