ভোলার মহসিন-আমেনা দম্পতি তাদের ছয় মাস বয়সী সন্তান তাকরিনকে নিয়ে লড়ছেন এক অসম লড়াই। একদিকে ছেলের জন্য হাম হয়ে দাঁড়িয়েছে মরণব্যাধি, অন্যদিকে বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউর পাহাড়প্রমাণ বিল। সন্তানের প্রাণ বাঁচাতে এখন বুক ফেটে গেলেও তাকে অন্য কারো হাতে তুলে দিতে চাইছেন এই অসহায় বাবা-মা। তাদের একমাত্র লক্ষ্য—তাকরিন যেন বেঁচে থাকে।
তাকরিনের বয়স মাত্র ছয় মাস। এই বয়সেই তার শরীরে হানা দিয়েছে হাম। সাধারণ হাম থেকে তৈরি হয়েছে মারাত্মক জটিলতা। গত দুই সপ্তাহ ধরে সে রাজধানীর মহাখালীর ইউনিভার্সেল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভেন্টিলেশনে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে।
তাকরিনের অসুস্থতা শুরু হয় ভোলায়। সেখান থেকে তাকে ঢাকায় আনা হয়। কিন্তু সরকারি হাসপাতালে আইসিইউ সঙ্কটের কারণে কোনো শয্যা মেলেনি। ভোলা এবং রাজধানীর দুটি সরকারি হাসপাতাল ঘুরেও যখন তাকরিনকে ভর্তি করা সম্ভব হয়নি, তখন বাধ্য হয়েই মহসিন তার সন্তানকে নিয়ে ছোটেন বেসরকারি হাসপাতালে। ২০ দিন ধরে হাসপাতালের বারান্দায় কাটছে তার দিন, ফলে বন্ধ হয়ে গেছে তার অটোরিকশা চালিয়ে পাওয়া আয়ের একমাত্র উৎসটিও।
হাসপাতালের গত দুই সপ্তাহের বিল এসেছে চার লাখ টাকারও বেশি। কিন্তু অটোরিকশা চালক মহসীন এ পর্যন্ত শোধ করতে পেরেছেন মাত্র ২০ হাজার টাকা। সাত সদস্যের পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী মহসীনের পক্ষে এই বিশাল অঙ্ক শোধ করা আকাশকুসুম কল্পনা।
অসহায় বাবা মহসিন বলেন, পরিচিত এক ভাইয়ের সহায়তায় এখানে ভর্তি করেছিলাম। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ টাকার দিকে না তাকিয়ে এখনও চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছে, তাদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। কিন্তু এই টাকা আমি শোধ করবো কীভাবে? আমি সরকারের কাছে হাত জোড় করে সাহায্য চাইছি।
এক পর্যায়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে তিনি বলেন, যদি কোনো বিত্তবান ব্যক্তি আমাদের সন্তানকে দত্তক নিতে চান, আমরা রাজি। মা-বাবা হিসেবে আমরা শুধু চাই আমাদের সন্তান বেঁচে থাকুক।
আইসিইউর দরজার বাইরে নিঘুম রাত কাটছে মা আমেনা বেগমের। তার দুই চোখের পানি যেন বাঁধ মানছে না। মা আমেনা বলেন, আমার একটাই আবেদন, আমার ছেলে যেন বেঁচে থাকে। ও যেন পৃথিবীর আলো-বাতাসে বড়ো হতে পারে।
হাসপাতালের নার্সিং সমন্বয়কারী ফারজানা আজাদ বলেন, মায়ের এই আকুতি আমাদেরও ছুঁয়ে যায়। তাকরিনের মায়ের কান্না সহ্য করা আমাদের জন্য খুব কঠিন। আইসিইউর সামনে এই হাহাকার কোনো ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।
ইউনিভার্সেল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নবজাতক ও শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মো. আব্দুর রাজ্জাক জানান, তাকরিনের অবস্থা অত্যন্ত জটিল ছিলো। দুই সপ্তাহের চিকিৎসায় সামান্য উন্নতি হয়েছে, তবে আরও বেশ কিছুদিন চিকিৎসা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, আমরা শুরু থেকেই শিশুটির প্রতি আন্তরিক। টাকার অঙ্ক যাই হোক, আমরা আগে চিকিৎসা নিশ্চিত করতে চাই। তার মা-বাবা যদি সরকারি হাসপাতালে নিতে চান, তবে প্রয়োজনে অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করে ওকে সরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরের ব্যাপারেও আমরা সহযোগিতা করবো।
সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, দেশজুড়ে এখন পর্যন্ত ৪২ হাজার ৭০৫ শিশুর শরীরে হাম ও এর উপসর্গ দেখা দিয়েছে। মঙ্গলবার (৫ মে) পর্যন্ত এই রোগে ও উপসর্গে ৩১৭ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
ভোলার দক্ষিণ দিঘলিয়া গ্রামের এই দম্পতির বড়ো মেয়ে তিন বছরের মোবাশ্বেরা এখন দাদাবাড়িতে। ছোট ভাইয়ের জীবনের বিনিময়ে হয়তো তাকে আজীবনের মতো পর করে দিতে হতে পারে—এই চরম বাস্তবতাকে মেনে নিয়েই এখন প্রহর গুনছেন এক অসহায় বাবা-মা। তারা কি পাবেন সরকার কিংবা কোনো সহৃদয় মানুষের ছায়া, নাকি চিকিৎসার খরচ মেটাতে সত্যিই কোলছাড়া করতে হবে নাড়িছেঁড়া ধনকে?
