পানি খামু আব্বু’—মাস্ক খুলে পানি খেতেই রক্তবমি, নিথর হয়ে গেল আবির!

পরন্ত চঞ্চল আবির নিস্তেজ হয়ে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে ছিল। স্যালাইনের সঙ্গে শরীরে যাচ্ছিল রক্ত ও প্লাটিলেট। এভাবেই তিন দিন আশঙ্কাজনক অবস্থায় কেটে গেল আগারগাঁওয়ের বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালে। কিন্তু ১৬ আগস্টও পরিবারটি বুঝতে পারেনি, দিনশেষে অ্যাম্বুলেন্স ডেকে ৬ বছরের ফুটফুটে শিশুটির নিথর দেহ নিয়ে ফিরতে হবে গ্রামের বাড়িতে!

আক্ষেপ ও কান্নায় ভেঙে পড়ে কথাগুলো বলছিলেন বাবা শফিউল ইসলাম। তিনি বলেন, “১৬ আগস্ট বিকেল ৩টার ২৬ মিনিটের দিকে ছেলেটা হাসপাতালের বেডে শুয়ে বলছিল, ‘পানি খামু আব্বু’। তখন ওর মুখে ছিল অক্সিজেন মাস্ক। মাস্ক খুলে পানি খেতেই কাশি আসে। কাশির সাথে ব্লেডিং। রক্ত মুখের বাইরেও আসে। মুখ মুছতে মুছতেই টের পাই ব্লাড ভাইঙ্গা পড়তেছে। একটু পরই আর আবির নাই। ডাক্তার বলছিল— শুধু ডেঙ্গু না, ওর নাকি ব্লাড ক্যান্সারও ছিল। যদিও তাতে আর কার কি আসে! যার যায় সেই শুধু বোঝে!”

https://www.profitableratecpmnetwork.com/amf60dmv?key=d2467ec9b6ee2416531fdae2a301da66

ছয় বছরের মো. আবির, শফিউল ইসলাম ও আঞ্জুআরা বেগম দম্পতির সর্বকনিষ্ঠ সন্তান। তাদের বাড়ি গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার উত্তর রাজিবপুর গ্রামে। জীবিকার তাগিদে গ্রাম ছেড়ে পরিবারটি থিতু হয়েছিল ঢাকার আশুলিয়ায়। কিন্তু ডেঙ্গুর সংক্রমণ থাবা বসাল তাদের জীবনে। মাসখানেক আগে আবিরের বাঁ হাতের হাড় ভেঙে গিয়েছিল। সেই ধকল কাটিয়ে উঠে আশুলিয়ার স্থানীয় একটি কিন্ডারগার্টেনের নার্সারিতে ভর্তি হয়েছিল সে। তবে, নতুন বই ও স্কুলে যাওয়ার আনন্দ উপভোগের সুযোগ আর পেল না শিশুটি।

আমি নিজেও পোশাক কারখানায় সামান্য বেতনে চাকরি করি। মাত্র চার দিনের চিকিৎসায় ১ লাখ ১৩ হাজার টাকা খরচ করতে হয়েছে। এই বিপুল অঙ্কের টাকা জোগাড় করতে আমাদের হিমশিম খেতে হয়েছে। কিন্তু দিনশেষে কোল খালি করেই ফিরতে হলো। বুকের মানিককে কবরে রেখে এসে কোনো কাজ-কামে মন বসে না। আমি বা আমরা কেউ কল্পনাও করতে পারিনি সামান্য মশার কামড়ে ডেঙ্গু হয়ে ছেলেটা এভাবে আমাদের ছেড়ে চলে যাবে
আবিরের বাবা শফিউল ইসলাম
বিজ্ঞাপন

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, এই দম্পতির তিন ছেলে। বড় ছেলে আলামিন (২৪) এইচএসসি পাসের পর পোশাক কারখানায় চাকরি করছেন। মেজ ছেলে আকাশ পড়ে সপ্তম শ্রেণিতে। তিন ভাইয়ের মধ্যে ছোট আবিরই ছিল বাবা-মায়ের সবচেয়ে আদরের ও চোখের মণি।

পরিবার জানায়, গত ৮ আগস্ট রাতে আবিরের শরীরে প্রথম জ্বরের উপসর্গ দেখা দেয়। পরদিন স্থানীয় পর্যায়ে ওষুধ দেওয়া হলেও অবস্থার উন্নতি হয়নি। ১৩ আগস্ট আশুলিয়ার জামগড়া নারী ও শিশু হাসপাতালে আবিরকে ভর্তি করা হলে সেখানে তার ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। ১৪ আগস্ট তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় স্থানান্তরের পরামর্শ দেন চিকিৎসকেরা। পরিবার প্রথমে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (পিজি) হাসপাতাল ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শয্যা পাওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। অবশেষে বিকেলে ঢাকা শিশু হাসপাতালে তাকে ভর্তি করা সম্ভব হয়। সেখানেই তিন দিনের তীব্র লড়াই শেষে ১৬ আগস্ট বিকেল সাড়ে ৩টায় মারা যায় আবির।

Share post:

আরও খবর