যৌনাঙ্গ চুরির গুজবে ছয় দেশে ৮০ জনের বেশি নিহত

আফ্রিকার ছয়টি দেশে যৌনাঙ্গ চুরি নিয়ে ছড়িয়ে পড়া মিথ্যা গুজবকে কেন্দ্র করে গত বছরের অক্টোবর থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত ৮০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। দেশগুলোর পুলিশ বাহিনীর কাছ থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে এ তথ্য জানিয়েছে বিবিসি গ্লোবাল ডিসইনফরমেশন ইউনিট।

সংবাদমাধ্যম বিবিসি বাংলা এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।

গুজব ছড়ানো হয়েছে, অপরিচিত কেউ পুরুষের পিঠে হাত দিয়ে সামান্য টোকা দিলেই তার যৌনাঙ্গ ছোট হয়ে যেতে বা অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভুয়া তথ্য এই গুজবকে আরও উসকে দিয়েছে।

মোজাম্বিকের উত্তরাঞ্চলীয় কাবো দেলগাদো অঞ্চলে এই গুজবের কারণে অনেকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এমন দাবিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন দেশে জনতা সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের ওপর হামলা চালিয়েছে। কয়েকজন পুরুষ দাবি করেছেন, অপরিচিত কারও সংস্পর্শে আসার পর তাদের পুরুষাঙ্গ ও অণ্ডকোষ সংকুচিত বা অদৃশ্য হয়ে গেছে। এরপর উত্তেজিত জনতা অভিযুক্ত ব্যক্তিদের কাছে কথিত ‘চুরি যাওয়া’ যৌনাঙ্গ ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছে।

আফ্রিকার কিছু অঞ্চলে এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়। বিশেষ করে জাদুটোনা ও কুসংস্কারে বিশ্বাস এখনও প্রবল এমন এলাকাগুলোতে বহু বছর ধরে এ ধরনের গুজব ছড়িয়েছে।

তানজানিয়ার মেকানিক বনিফাস এমগালা এপ্রিলে এমনই এক হামলার শিকার হন। গাড়ি বিক্রির জন্য এক ক্রেতার সঙ্গে দেখা করতে তিনি ও তার এক বন্ধু দেশটির সীমান্তবর্তী বাণিজ্যিক শহর তুন্দুমায় যান। কাজ শেষ হওয়ার আগে তারা একটি রেস্তোরাঁয় খাবার খেতে বসেছিলেন।

আরও পড়ুনঃ  সৌদি-ইরান সমর্থিত বাহিনীর তীব্র সংঘর্ষ, নিহত ৮১

তানজানিয়ার অনেক এলাকায় একই ধরনের গুজব ছড়িয়ে পড়ে
কিছুক্ষণ পর একদল উত্তেজিত মানুষ তাদের টেনেহিঁচড়ে বাইরে নিয়ে যায়। পরে তাদের মারধর করা হয়। হামলায় এমগালার চোয়ালে আঘাত লাগে এবং একটি দাঁত ভেঙে যায়। একপর্যায়ে তিনি জ্ঞান হারান। দুই দিন পর হাসপাতালে জ্ঞান ফিরলে জানতে পারেন, তার বন্ধু মারা গেছেন।

এখনো খুঁড়িয়ে হাঁটতে হয় এমগালাকে। কাজে ফিরতে পারেননি তিনি। স্ত্রী ও চার সন্তানকে নিয়ে বাড়িতে অবস্থান করছেন। প্রয়োজনীয় ওষুধের খরচে তাকে সহায়তা করছেন প্রতিবেশী ও বন্ধুরা।

এমগালা বলেন, ‘সেদিন যে মৃত্যুর কত কাছাকাছি চলে গিয়েছিলাম তা যদি আগে জানতাম, তবে আমি ওই রেস্তোরাঁয় খেতে যেতাম না।’

সামাজিক মাধ্যমে ছড়াচ্ছে সহিংসতার ভিডিও
তুন্দুমায় একই দিনে আরেকটি হামলা প্রত্যক্ষ করেন ফটোগ্রাফার ও ব্যবসায়ী মাইকেল সিলাভওয়ে। তার ভাষ্য, কথিত ‘চুরি যাওয়া যৌনাঙ্গ’ নিয়ে ভিডিও টিকটকসহ সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকায় আতঙ্ক বাড়তে থাকে।

তিনি জানান, এক ব্যক্তিকে মারধরের পর আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। ঘটনার একটি ভিডিওও বিবিসি গ্লোবাল ডিসইনফরমেশন ইউনিট যাচাই করেছে। টিকটক ও ফেসবুকে ভিডিওটি এক লাখের বেশি মানুষ দেখেছে।

মোজাম্বিক ও কেনিয়াতেও একই ধরনের হামলার ভিডিও যাচাই করেছে বিবিসি। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এসব পোস্টের মধ্যে দলবদ্ধ হামলার ভিডিও, কথিত প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, ভবিষ্যৎ হামলার সতর্কবার্তা এবং বিভিন্ন এলাকার ঘটনা নিয়ে নানা দাবি রয়েছে।

মোজাম্বিকে নিহত ৫৫
গুজবের কারণে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে মোজাম্বিকে। দেশটির পুলিশ গত মে মাসে জানিয়েছিল, ছয় সপ্তাহে একজন পুলিশ কর্মকর্তা, স্বাস্থ্যকর্মী ও সরকারি কর্মচারীসহ ৫৫ জন নিহত হয়েছেন।

আরও পড়ুনঃ  ছাত্রের সঙ্গে যৌন মিলন করে ফেঁসে গেলে স্কুল মেডাম

মোজাম্বিকের প্রেসিডেন্ট ড্যানিয়েল চাপো এসব গুজব ও হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, দাবিগুলো মিথ্যা এবং কারও শরীরের কোনো অংশ হারিয়ে যাওয়ার বিষয়ে চিকিৎসাগত কোনো প্রমাণ সরকার পায়নি।

ইসলামী উগ্রপন্থার কারণে প্রায় এক দশক ধরে অস্থির থাকা দেশটির ক্যাবো ডেলগাদো প্রদেশে গত এপ্রিল মাসে দুটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রেও হামলা হয়। পরে জনসচেতনতামূলক প্রচারণা চালানোর সময় ওই এলাকার স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো কয়েক সপ্তাহ বন্ধ রাখতে হয়েছিল।

সরকার জানিয়েছে, মানুষের এই আতঙ্কের কিছু অংশ ‘কোরো সিনড্রোম’ নামে পরিচিত একটি মানসিক অবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। এ অবস্থায় ব্যক্তি মনে করতে পারেন, তার যৌনাঙ্গ শরীরের ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে বা সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে।

কেনিয়া ও মালাউইয়েও প্রাণহানি
কেনিয়ার কোয়ালে ও মোম্বাসা উপকূলীয় কাউন্টিতে একই ধরনের গুজবকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সহিংসতায় পাঁচজন নিহত হয়েছেন।

কেনিয়ায়ও এই ধরনের একাধিক হামলার ঘটনা ঘটেছে
মোম্বাসা কাউন্টির কমিশনার মোহাম্মদ নুরের অভিযোগ, কিছু কনটেন্ট ক্রিয়েটর বেশি ভিউ ও এনগেজমেন্ট পাওয়ার আশায় এসব দাবি ছড়িয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এই ধরনের ভুল তথ্য সহজেই প্রাণহানির কারণ হতে পারে।’

পুলিশ পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে। তাদের মধ্যে এক বাবা ও ছেলেকেও এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেশী মালাউইতেও একই ধরনের গুজব জনতাকে হামলায় উসকে দেয়। সেখানে আটজন নিহত হয়েছেন।

গুজব ছড়াতে সামাজিক মাধ্যমের ভূমিকা
লেখক জুলিয়েন বনহোমের মতে, স্মার্টফোন ও সামাজিক মাধ্যম গুজব দ্রুত ছড়িয়ে দিতে এবং তা বিপুলসংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে বড় ভূমিকা রাখছে। একবার কোনো গুজব ছড়িয়ে পড়লে তা নিয়ন্ত্রণ করাও কঠিন হয়ে পড়ে।

আরও পড়ুনঃ  জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী ও তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীসহ ৪ জনকে হত্যা, গ্রেপ্তার ২

তার বই দ্য সেক্স থিভস: দ্য অ্যানথ্রোপোলজি অব আ রিউমার-এ যৌনাঙ্গ চুরির মতো গুজব কীভাবে ছড়ায় এবং মানুষ কেন তা বিশ্বাস করে, তা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

এই ধরনের গুজব ছড়িয়ে পড়ার পেছনে সামাজিক মাধ্যমের ভূমিকা দেখছেন অনেকে
তার মতে, সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও এসব দাবিকে মানুষের কাছে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে পারে। কারণ ভিডিওতে ঘটনাটি সরাসরি ঘটছে বলে মনে হয়।

এদিকে সামাজিক মাধ্যমের কিছু কনটেন্ট ক্রিয়েটর মানুষকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানালেও তারা নিজেরা এসব দাবি বিশ্বাস করেন নাকি শুধু জনপ্রিয়তা ও এনগেজমেন্টের জন্য ছড়াচ্ছেন, তা অনেক ক্ষেত্রে স্পষ্ট নয়। আবার কেউ কেউ ‘যৌনাঙ্গ চুরি’ থেকে রক্ষার কথিত তাবিজ-কবচের প্রচারণাও চালাচ্ছেন। কৌতুক অভিনেতাদের কেউ কেউ এসব দাবিকে ব্যঙ্গ করে ভিডিও তৈরি করেছেন।

মেটার এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানটি শেয়ার করা বিষয়বস্তু পর্যালোচনা করছে এবং নীতিমালা লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে টিকটক এ বিষয়ে বিবিসির মন্তব্যের অনুরোধের জবাব দেয়নি।

এমগালা শারীরিকভাবে কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠলেও বন্ধুর মৃত্যুর স্মৃতি এখনো তাকে কষ্ট দেয়। তিনি বলেন, ‘আমার বন্ধুর মৃত্যু যে এতটা অর্থহীনভাবে ঘটেছিল, সেই কথা মনে পড়লে এখনো গভীরভাবে কষ্ট পাই।’

আপনার মতামত লিখুনঃ

Share post:

আরও খবর