প্রশাসনিক গতিশীলতা বাড়ানো, কাজের পরিধি বিবেচনা এবং সরকারের কার্যক্রমে গতি আনতে মন্ত্রিসভার কলেবর বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। বিশ্বস্ত সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, চলতি মাসের শেষ দিকে অথবা আগামী মাসের শুরুতে মন্ত্রিসভায় বড় ধরনের রদবদল ও সম্প্রসারণের সম্ভাবনা রয়েছে।
বিএনপি ও সরকারের জনপ্রশাসনসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সরকারের কার্যক্রমে গতি আনা, দায়িত্বপ্রাপ্তদের কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রিসভার সদস্য সংখ্যা ৫১ জন। এর মধ্যে পূর্ণ মন্ত্রী ২৬ জন এবং প্রতিমন্ত্রী ২৪ জন। এর বাইরে প্রধানমন্ত্রীর ১১ জন উপদেষ্টা রয়েছেন। তাদের মধ্যে ছয়জন মন্ত্রী এবং পাঁচজন প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় দায়িত্ব পালন করছেন।
এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘পরিবর্তনের আলোচনা সত্যি। তবে চূড়ান্ত তারিখ বা সময় একমাত্র প্রধানমন্ত্রী বলতে পারবেন।’
আগের রদবদলের পর নতুন করে আলোচনা
সরকার গঠনের ছয় মাসের মাথায় মন্ত্রিসভায় প্রাথমিক পর্যায়ে রদবদল করা হয়েছিল। ওই পরিবর্তন নিয়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। সরকারসংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ এটিকে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত ছয় মাসের কর্মমূল্যায়নের প্রাথমিক ফল হিসেবে দেখেছিলেন। আবার অনেকে একে শূন্য পদ পূরণ, দপ্তর পুনর্বণ্টন ও রাজনৈতিক সমন্বয়ের অংশ হিসেবে দেখেন।
ওই রদবদলের পর মন্ত্রিসভার কাঠামো ও দক্ষতা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। কয়েকটি মন্ত্রণালয়ে পূর্ণ মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা একই সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। আবার তুলনামূলক ছোট কিছু মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রী রাখার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
যাদের নিয়ে আলোচনা
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, স্বরাষ্ট্র, কৃষি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে কাজের চাপ বিবেচনায় নতুন প্রতিমন্ত্রী যুক্ত করার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে অভিজ্ঞ নেতাদের পূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব এবং অপেক্ষাকৃত নবীনদের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় থাকতে পারে।
সম্ভাব্য মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুক, ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল এবং যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেলের নাম আলোচনায় রয়েছে।
এ ছাড়া দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী এবং নবনিযুক্ত স্থায়ী কমিটির সদস্য আমান উল্লাহ আমানের নামও সম্ভাব্য তালিকায় রয়েছে বলে জানা গেছে।
আলোচনায় থাকা অন্যদের মধ্যে রয়েছেন সংসদের হুইপ রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, এ বি এম আশরাফ উদ্দীন নিজান, বিএনপির প্রশিক্ষণবিষয়ক সম্পাদক এ বি এম মোশাররফ হোসেন, সংসদ সদস্য মজিবুর রহমান, সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য মাহমুদা হাবিবা, সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ এবং মো. আবুল কালাম (চৈতি কালাম)।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পরিবর্তনের আলোচনা
সম্ভাব্য রদবদলের আলোচনায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ। সংশ্লিষ্ট মহলে শিক্ষামন্ত্রীর আচরণ ও বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে অসন্তোষের কথা বলা হচ্ছে। বিশেষ করে দুর্যোগকালীন সময়ে পরীক্ষা গ্রহণ, বিভিন্ন বক্তব্য এবং কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলনকে অন্য কোনো মন্ত্রণালয়ে সরিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা রয়েছে। তার পরিবর্তে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও উপদেষ্টা মাহাদী আমিন অথবা শিক্ষক নেতা ও সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়ার নাম আলোচনায় রয়েছে।
তরুণ ও শিক্ষিত নেতৃত্বের মাধ্যমে শিক্ষা খাতের সংস্কার কার্যক্রম আরও গতিশীল করার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়েও পরিবর্তনের আভাস
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়েও পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুলের বিভিন্ন বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের একটি অনুষ্ঠানে মন্ত্রীর বক্তব্যের সময় প্রধানমন্ত্রী তাকে মূল বিষয়ের মধ্যে থাকার নির্দেশ দিয়েছিলেন বলেও জানা গেছে। এ ছাড়া নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় ‘আদ-দীন’ হাসপাতালের লাইসেন্স স্থগিত এবং পরে সেই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।
কমতে পারে কয়েকজন মন্ত্রীর দায়িত্ব
সরকারের কার্যক্রমে গতি আনতে একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা কয়েকজন মন্ত্রীর দায়িত্ব কমানোর বিষয়েও আলোচনা চলছে। বর্তমানে তিনটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা একজন পূর্ণ মন্ত্রীর কাছ থেকে একটি দপ্তর সরিয়ে সংসদ সদস্য শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাসকে দেওয়ার সম্ভাবনার কথা জানা গেছে।
সামগ্রিকভাবে তিনজন মন্ত্রীর দায়িত্ব কমানো এবং একজন প্রতিমন্ত্রীর দপ্তর পরিবর্তনের বিষয়েও গুঞ্জন রয়েছে।
এদিকে, রাজধানীর সার্কিট হাউস সড়কে উল্টো পথে গাড়ি চালানোর অভিযোগে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতের গাড়ির বিরুদ্ধে ট্রাফিক পুলিশের মামলা নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে। এ ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অসন্তুষ্ট হয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে।
কৃষি মন্ত্রণালয় নিয়েও অসন্তোষ
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকাণ্ডে প্রত্যাশিত অগ্রগতি না থাকায় সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। এর ফলে বর্তমান দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী হাজি আমিনুর রশীদ ইয়াসিনের দপ্তর পরিবর্তন বা মন্ত্রিসভায় রদবদল হতে পারে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে।
তবে এসব বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘পরিবর্তন হতে পারে। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী ভালো বলতে পারবেন। যদি পরিবর্তন হয়, তবে দেশ ও জনগণের স্বার্থে কাকে যুক্ত করা যায়, তা তিনিই ভালো বোঝেন।’
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘পুনর্গঠন বা রদবদল দল ও সরকারের একটি রুটিন কাজ। প্রয়োজনের তাগিদেই এটি করা হয়। সরকারপ্রধান প্রয়োজন অনুভব করলে দায়িত্বপ্রাপ্তদের কার্যসম্পাদন মূল্যায়ন করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন।’
তবে মন্ত্রিসভায় সম্ভাব্য এই সম্প্রসারণ ও রদবদল নিয়ে এখনো সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা আসেনি।

