সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের দ্বিতীয় স্ত্রী বিদিশা সিদ্দিককে রাজধানীর গুলশান থেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। একটি প্রতারণা মামলায় আদালতের দেওয়া দুই বছরের সাজা এবং তার বিরুদ্ধে জারি হওয়া গ্রেপ্তারি পরোয়ানার ভিত্তিতে মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) রাত সাড়ে ৮টার দিকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গুলশানের একটি রেস্টুরেন্ট থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
গুলশান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দাউদ হোসেন গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, প্রতারণার একটি মামলায় বিদিশার দুই বছরের সাজা হয়েছে। একই সঙ্গে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। আদালতের জারি করা পরোয়ানার ভিত্তিতেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
মামলার নথি অনুযায়ী, বারিধারার প্রেসিডেন্ট পার্কের একটি ফ্ল্যাট বিক্রির নামে প্রতারণার অভিযোগে ২০০৮ সালে গুলশান থানায় মামলা করেন ব্যবসায়ী মোশাররফ হোসেন সিকদার। ফ্ল্যাট হস্তান্তরের নামে প্রতারণার অভিযোগ আনা হয় বিদিশার বিরুদ্ধে।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, মোশাররফ হোসেন মিরপুর-১০ এলাকায় স্যানিটারি পণ্যের আমদানিকারক ও ব্যবসায়ী। ২০০১ সালে বারিধারায় একটি ফ্ল্যাট কেনার জন্য তিনি বিদিশার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে প্রেসিডেন্ট পার্কের একটি ফ্ল্যাট ৮০ লাখ টাকায় বিক্রির জন্য চুক্তি হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০০১ সালের ১০ জুলাই বিদিশা মোশাররফকে বনানীর রজনীগন্ধা অফিসে ডাকেন। সেখানে তার মনোনীত ব্যক্তি ও বন্ধু আব্দুল রাজ্জাকের নামে ৭৫ লাখ টাকার পে-অর্ডার দিতে বলা হয়। পরে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের কাওরান বাজার শাখার মাধ্যমে ওই টাকা পরিশোধ করেন মোশাররফ। এরপর উভয়ের মধ্যে বায়নানামা সম্পাদন করা হয়।
চুক্তি অনুযায়ী, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেওয়ার পর বাকি টাকা পরিশোধ করে ফ্ল্যাটটি রেজিস্ট্রি করে দেওয়ার কথা ছিল। ২০০২ সালের ১০ জুলাইয়ের মধ্যে ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দেওয়ার কথা থাকলেও তা দেওয়া হয়নি বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়। বছরের পর বছর ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য চাপ দেন বাদী। একপর্যায়ে টাকা ফেরত দেওয়ার আশ্বাস দেন বিদিশা। পরে ২০০৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি ৭২ লাখ টাকার একটি চেক দেওয়া হয়। ব্যাংকে জমা দেওয়ার পর হিসাবে পর্যাপ্ত টাকা না থাকায় চেকটি ডিজঅনার হয়।
অন্যদিকে, মামলার আরেক বর্ণনায় বলা হয়েছে, ৭৫ লাখ টাকার চেক দেওয়া হলেও ২০০৫ সালের ২ মে সেটি পর্যাপ্ত অর্থের অভাবে প্রত্যাখ্যাত হয়। টাকা ফেরত পাওয়ার চেষ্টা করলে হুমকি-ধামকি দেওয়ার অভিযোগও করেন বাদী।
মামলায় আরও অভিযোগ করা হয়, এরপর বিভিন্ন অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করা হয়। টাকা কিংবা ফ্ল্যাট—কোনোটিই বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। টাকা ফেরত বা ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দেওয়ার দাবি করলে সন্ত্রাসী দিয়ে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন বাদী। বাদীর দাবি, বিদিশা তাকে জানিয়েছিলেন, সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদের কাছ থেকে টাকা আদায় না হওয়া পর্যন্ত তাকে অপেক্ষা করতে হবে।
দীর্ঘদিন মামলার বিচারিক কার্যক্রম চলার পর সাক্ষ্যগ্রহণ ও শুনানি শেষে গত ২০ মে রায় দেন ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জামসেদ আলম। রায়ে বিদিশা এরশাদকে দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একই সঙ্গে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। জরিমানা অনাদায়ে আরও এক মাসের কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়।
রায়ের পর বিদিশার প্রতিক্রিয়া জানতে যোগাযোগ করা হলে তিনি মামলাটি সম্পর্কে বিস্ময় প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘এই মামলার বিষয়ে আমার কোনও আইডিয়া নেই।’
পুলিশ জানায়, রায়ের পর আদালত থেকে বিদিশার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়। সেই পরোয়ানা কার্যকর করতেই মঙ্গলবার রাতে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
বিদিশা সিদ্দিক সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের দ্বিতীয় স্ত্রী। পরে তাদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়। এই দম্পতির এক ছেলে রয়েছে।

