রাজধানীর কাকরাইলে জাতীয় পার্টির (জাপা) কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে দিয়ে আওয়ামী লীগবিরোধী মিছিল নিয়ে যাওয়ার সময় গণঅধিকার পরিষদের (জিওপি) নেতাকর্মীদের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ এবং হামলার ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার (২৯ আগস্ট) রাতে ঘটনার সময়ের ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, দলটির ছাত্রনেতা সম্রাটকে লাল টি-শার্ট পরা ব্যক্তি বেধড়ক পেটাচ্ছেন। পরে সেনাবাহিনী তাকে আটক করলে হেলমেট পরা এক পুলিশ সদস্য এসে তাকে নিয়ে যায়। এর পর তার আর খোঁজ মিলেনি। এ নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হলে তার পরিচয় শনাক্তে কাজ শুরু করে পুলিশ।
এদিকে এ ঘটনার গণঅধিকার পরিষদের নেতা রাসেদ খান তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে বলেন, হামলা করা ওই ব্যক্তি পুলিশের কনস্টেবল। তার নাম মিজানুর রহমান। বিপি নং – ৯৭১৭১৯৭২৪৩। তিনি পল্টন থানার ওসির ড্রাইবার।
এ বিষয়ে সত্যতা নিশ্চিত করতে মতিঝিল জোনের ডিসি, পল্টন থানার ওসিসহ থানার কয়েকজন পুলিশের কর্মকর্তাকে কল দিলেও তারা কল রিসিভি করেন নি। এদিকে ভিডিওটি ভাইরাল হলে প্রথম অনেকে তাকে ডিবি সদস্য বললেও ডিবি তাদের সদস্য নয় বলে নিশ্চিত করেন।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ডিবির যুগ্ম-কমিশনার মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে নিশ্চিত করে বলেন, ভাইরাল হওয়া লাল টি-শার্ট পরহিত ব্যক্তি ডিবির কেউ না। গতকাল ওখানে যারা দায়িত্বে ছিল সকলেই ডিবির পোষাক পড়া ছিল। সিভিল পোষাকে কেউ ছিল না। ওই ব্যক্তির পরিচয় শনাক্তে আমাদের কয়েকটি টিম কাজ করছে।
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) রমনা বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার মীর আসাদুজ্জামান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘ঘটনার সময় লাল টি-শার্ট পরে গণ অধিকার নেতার ওপর হামলা করা ব্যক্তিকে খুঁজছে পুলিশ। খুব দ্রুত তাকে শনাক্ত করতে আমাদের কয়েকটি টিম কাজ করছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ভিডিওতে দেখা লাঠি হাতে থাকা ওই ব্যক্তিকে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা আটক করলেও তাৎক্ষণিক বিষয়টি না জানায় তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।’
আওয়ামী লীগবিরোধী মিছিল নিয়ে যাওয়ার সময় গণঅধিকার পরিষদের নেতাকর্মীদের ওপর জাপার নেতাকর্মীরা হামলা চালিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন দলটির নেতারা। এ ঘটনার প্রতিবাদে শুক্রবার রাত ৮টার কিছুক্ষণ পর কাকরাইল এলাকায় মশাল মিছিল বের করে গণঅধিকার পরিষদ। এ সময় জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা লাঠিসোঁটা নিয়ে মিছিলে হামলার চেষ্টা চালালে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে পরিস্থিতি। বিক্ষোভকারীরাও তখন মিছিল থেকে ইটপাটকেল ছুড়ে প্রতিরোধ করে এবং পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে জাপার কার্যালয় চত্বরে প্রবেশ করে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা লাঠিচার্জ করেন। সংঘর্ষের একাধিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। একটি ভিডিওতে দেখা যায়, সেনাবাহিনী ও পুলিশের একাধিক সদস্য গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরের ওপর লাঠিচার্জ করছেন।
এ ঘটনারই একপর্যায়ে লাল টি-শার্ট পরা এক ব্যক্তি ‘জুলাই ভরে দেব’ বলে চিৎকার করে নুরকে বেধড়ক মারধর করে। পরবর্তী একটি ভিডিওতে দেখা যায়, লাঠি হাতে থাকা সেই ব্যক্তিকে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা আটক করলেও পরে তাকে ছেড়ে দেন।
আরও পড়ুন: হামলায় জড়িত সেনা সদস্যদের প্রকাশ্যে বিচার করতে হবে, গোপনে নয় : রাশেদ খান
মারধরে গুরুতর আহত হন গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরসহ সংগঠনটির বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী এবং একজন পুলিশ সদস্য। আহতদের মধ্যে রয়েছেন—গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান (৩২), হাসান তারেক (২৮), ফারজানা কিবরিয়া (৩০), মইনুল ইসলাম (৩৫), মেহবুবা ইসলাম (৩০), আবু বক্কর (৩০), তারেক আজাদ (২৫) এবং পুলিশ ইন্সপেক্টর আনিছুর রহমান (৪২)। আহতদের শুক্রবার রাতেই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘ভিডিও ফুটেজে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, প্রথমে পুলিশ ও সেনাবাহিনী আমাদের ওপর হামলা করে। সেনাবাহিনীর একজন সদস্য নুরের বুকে লাঠি দিয়ে গুতা দেয়। এরপর নুরুল হক নুর যখন মাটিতে পড়ে যান, তখন একটি সময় লাল টি-শার্ট পরা ওই ব্যক্তি এসে বেধড়ক মারধর শুরু করে। এ ধরনের সংঘর্ষের ঘটনাগুলোতে সাধারণত সিভিল পোশাকে ডিবি অথবা গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা থাকে। এখন ওই ব্যক্তিটি কে—এটা চিহ্নিত করা পুলিশের ও সেনাবাহিনীর দায়িত্ব।’
তিনি আরও বলেন, ‘যারা ভিপি নুরসহ আমাদের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালিয়েছে, তাদের প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনতে হবে। এটা আমাদের দাবি। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া জরুরি।’
এদিকে গণঅধিকার পরিষদের উচ্চতর সদস্য ও গণমাধ্যম সমন্বয়ক আবু হানিফ বলেন, ‘আওয়ামী লীগের দোসরদের কার্যক্রম নিষিদ্ধের দাবিতে আজকের বিক্ষোভ সমাবেশ ছিল। কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সমাবেশ শেষে আমরা পল্টন জিরো পয়েন্ট থেকে মিছিল নিয়ে নাইটিঙ্গেল মোড়ের দিকে যাচ্ছিলাম। এ সময় জাতীয় পার্টির কার্যালয়ের সামনে দিয়ে যাওয়ার মুহূর্তে আমাদের পেছন থেকে ইটপাটকেল ছোড়া শুরু হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘সেই সময় জাতীয় পার্টির কার্যালয়ের সামনে ৩-৪ শতাধিক লোক উপস্থিত ছিল। আমাদের ধারণা, জাতীয় পার্টির পাশাপাশি সেখানে আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের সন্ত্রাসীরাও ছিল।’
আবু হানিফ বলেন, ‘এই ঘটনায় আমাদের ১০-১৫ জন নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। তাদের অনেককেই চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।’