Saturday, August 30, 2025

ছয় দল নিয়ে এগোচ্ছে জামায়াত, বিএনপির সঙ্গে নিষ্ফল বৈঠক

আরও পড়ুন

জুলাই সনদ বিষয়ে মতভিন্নতা কমিয়ে আনতে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে একটি অনানুষ্ঠানিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে বৈঠক থেকে কোনো ইতিবাচক ফল আসেনি। গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় মন্ত্রিপাড়ায় বৈঠকটি হয় বলে দুদলের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে।

অনানুষ্ঠানিক ওই বৈঠকের আগে বিকেলে জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন, এনসিপি, গণঅধিকার পরিষদ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, এবি পার্টি এবং খেলাফত মজলিস একটি বৈঠক করে। তাতে জুলাই সনদ ছাড়া নির্বাচন হতে দেওয়া হবে না– এমন মনোভাব তুলে ধরে দলগুলো। প্রয়োজনে সনদের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনের কথাও বলা হয় বৈঠকে।

রাজনৈতিক সূত্রগুলো সমকালকে বলেছে, মূলত বিএনপির সঙ্গে বৈঠকের আগে জামায়াত এই দলগুলোর সঙ্গে আলোচনায় বসে এবং সবার মতামত বিএনপির কাছে তুলে ধরে। তবে বিএনপি ভোটের অনুপাতে আসন বণ্টন (পিআর) পদ্ধতিতে নির্বাচন এবং নির্বাচনের আগে সংবিধান সংস্কারের বিপক্ষে তাদের আগের অবস্থানের কথাই জানায়।
জামায়াতের সঙ্গে বৈঠকে বিএনপির প্রতিনিধিত্ব করেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ। জামায়াতের প্রতিনিধিত্ব করেন দলটির নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. হামিদুর রহমান আযাদ।

সূত্র জানায়, সালাহউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে বৈঠকে বরফ না গলায় জামায়াত বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাইছে। জামায়াত ২৩ বছর তাঁর নেতৃত্বে রাজনীতি করেছে। দলটির নেতাদের মূল্যায়ন, সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে সংস্কারের গুরুত্ব বোঝানো সম্ভব হবে।

নির্বাচন কমিশন গত বৃহস্পতিবার আগামী সংসদ নির্বাচনের পথনকশা ঘোষণা করেছে। নভেম্বরের মধ্যে সব প্রস্তুতি শেষ করে আগামী ফেব্রুয়ারিতে রোজার আগেই ভোট করার জন্য ২৪টি কাজ চিহ্নিত করে তা শেষ করার সময়সূচি ঘোষণা করে কমিশন। বিএনপি একে স্বাগত জানায়। জামায়াত ‘সংঘাত এড়াতে পিআর পদ্ধতিতে পথনকশা ঘোষণা’র দাবি জানায়। এনসিপি জুলাই সনদকে আইনি ভিত্তি না দিয়ে নির্বাচনের পথনকশা ঘোষণাকে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের শামিল বলে প্রতিক্রিয়া জানায়।

এর আগে অনুষ্ঠিত সাত দলের বৈঠকে জামায়াতের দুই নেতা ছাড়াও ছিলেন ইসলামী আন্দোলনের আমির চরমোনাই পীর সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম, এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব, গণঅধিকারের সভাপতি নুরুল হক নুর, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু এবং খেলাফত মজলিসের
মহাসচিব ড. আহমেদ আবদুল কাদের।

আরও পড়ুনঃ  কেন বিএনপি ওয়াকআউট করল? যে কারণ জানালেন সালাহউদ্দিন

আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে এই নেতাদের কেউ সমকালের কাছে বৈঠকের সত্যতা স্বীকার বা অস্বীকার করেননি। তবে জামায়াত নেতা ডা. তাহের সমকালকে বলেছেন, পিআর এবং জুলাই সনদের অধীনে নির্বাচন চায় এমন দলগুলোর সঙ্গে জামায়াতের যোগাযোগ এবং আলোচনা চলছে।
এনসিপি সূত্রের দাবি, নাহিদ ইসলাম এ বৈঠকের উদ্যোগ নেন। দলগুলোর মধ্যে সমন্বয় করেন আরিফুল ইসলাম আদীব। তবে তারা দুজনই বৈঠক বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।
মজিবুর রহমান মঞ্জুর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সরাসরি বক্তব্য না দিয়ে বলেন, জুলাই সনদ নিয়ে একই অবস্থানে থাকা দলগুলোর মধ্যে প্রয়োজনে কথা হয়।

বিএনপি-জামায়াত বৈঠক
রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দুই দফা সংলাপের পর ১৬ আগস্ট প্রধান উপদেষ্টার নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐকমত্য কমিশন জুলাই সনদের সমন্বিত খসড়া দিয়েছে। এতে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব বিষয়ে কমিশনের সিদ্ধান্ত এবং আট দফা অঙ্গীকার রয়েছে।

৮৪ সিদ্ধান্তের মধ্যে ৭৩টিতে দলগুলোর ঐকমত্য হয়েছে। বাকিগুলোতে বিভিন্ন দলের নোট অব ডিসেন্ট (আপত্তি) রয়েছে। যে ১১ সিদ্ধান্তে ঐকমত্য হয়নি, এর ৯টিতেই বিএনপির আপত্তি রয়েছে। দলটি পিআর পদ্ধতিতে ১০০ আসনের উচ্চকক্ষ গঠন, দুদক ও তিন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের জন্য সাংবিধানিক নিয়োগ কমিটি গঠন, প্রধানমন্ত্রীর একাধিক পদে থাকার সিদ্ধান্তে একমত নয় তারা। দলটি জানিয়েছে, ক্ষমতায় গেলে তারা এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবে না।

অঙ্গীকারনামায় বলা হয়েছে, সংবিধান ও আইনের ওপরে প্রাধান্য পাবে সনদ। সনদ নিয়ে আদালতে প্রশ্ন তোলা যাবে না। বাস্তবায়নযোগ্য সংস্কারের সিদ্ধান্তগুলো নির্বাচনের আগেই কার্যকর করা হবে। বিএনপি এসব অঙ্গীকারে একমত নয়।

দলটি সনদের খসড়ায় মতামতে বলেছে, সংবিধানের ওপরে কিছুই প্রাধান্য পেতে পারে না। আদালতে প্রশ্ন তোলার সুযোগ বন্ধ হলে নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ন হবে। যেসব সংস্কার কার্যকরে সংবিধান সংশোধন করতে হবে, সেগুলো আগামী সংসদে বাস্তবায়ন হবে।

আরও পড়ুনঃ  সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জামায়াতকে সমাবেশের অনুমতি — মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে কালিমা লেপন বলছে ছাত্র ইউনিয়ন

জামায়াত এ অবস্থানের বিরোধী। দলটি চায় সংবিধানের ওপরে সনদের প্রাধান্য। তারা সনদ নিয়ে আদালতের প্রশ্ন তোলার সুযোগ রহিতের পক্ষে। দলটির দাবি, নির্বাচনের আগেই সংবিধান সংস্কারসহ সনদের বাস্তবায়ন করতে হবে। জামায়াত সংসদের উভয় কক্ষেই পিআর চায়। দলটি সনদের অঙ্গীকারে পিআর যুক্ত করা এবং যেসব সংস্কারে তাদের নোট অব ডিসেন্ট রয়েছে, সেগুলোসহ ৮৪টিরই বাস্তবায়ন চায়।
এ অবস্থায় মঙ্গলবার সরকারি মধ্যস্থতায় বিএনপি-জামায়াতের বৈঠকটি হয় বলে সূত্র জানায়। বিএনপি নোট অব ডিসেন্ট দেওয়া ৯ সংস্কার বিষয়ে আগের অবস্থানেই রয়েছে। সালাহউদ্দিন আহমেদ বৈঠকে বলেছেন, এগুলোতে ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। শুধু নিম্নকক্ষ নয়, উচ্চকক্ষেও পিআর মানবে না বিএনপি।

জামায়াত জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোট বা রাষ্ট্রপতি আদেশ চায়। ঐকমত্য কমিশনকে বিশেষজ্ঞরা গণভোট বা বিশেষ সাংবিধানিক আদেশের মাধ্যমে সনদ বাস্তবায়নের পরামর্শ দিয়েছেন।
জামায়াতের সঙ্গে বৈঠকে সালাহউদ্দিন স্পষ্ট করেন– বিএনপি গণভোটের পক্ষে নয়। আর বিশেষ সাংবিধানিক আদেশ টেকসই হবে কিনা, তাও ভাবা উচিত। তাতে পরবর্তী সংসদের অনুমোদন লাগবে।
জামায়াত নেতারাও বৈঠকে দলীয় দাবির পক্ষে অনড় থাকেন। তারা বলেন, পিআর পদ্ধতিতেই নির্বাচন হতে হবে।

বৈঠকের সত্যতা স্বীকার বা অস্বীকার করেননি জামায়াত নেতা হামিদুর রহমান আযাদ। তিনি নির্বাচনী পথনকশা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সমকালকে বলেন, ‘জুলাই সনদ ছাড়া কীভাবে নির্বাচন হবে? প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলছেন, পিআর সংবিধানে নেই। সংবিধানে কি অন্তর্বর্তী সরকার আছে? সেই অন্তর্বর্তী সরকারের নিয়োগ করা নির্বাচন কমিশন যেভাবে সংবিধানের দোহাই দিচ্ছে, তাতে তাদের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব হবে কিনা– তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সুষ্ঠু নির্বাচন ছাড়া দেশের সংকট দূর হবে না।’

সনদ ছাড়া ভোট নয়: সাত দল
জামায়াতের মতো এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন, এবি পার্টি, গণঅধিকার পরিষদ, দুই খেলাফতও সনদের আইনি ও সাংবিধানিক ভিত্তি চায়। দলগুলোর দাবি, সনদের অধীনে নির্বাচন হতে হবে।
এনসিপি সনদের ওপর সংবিধানের প্রাধান্য চায় না। দলটি সনদকে সংবিধানের ‘গাইডিং প্রিন্সিপাল’ হিসেবে চায়। দলটির দাবি, সনদের অধীনে আগামী নির্বাচনে গণপরিষদ গঠিত হবে। গণপরিষদ সংস্কারকে অনুমোদন করার পর তা সংসদে রূপান্তরিত হবে।

আরও পড়ুনঃ  কোন দলের হয়ে নির্বাচন করবেন আসিফ মাহমুদ জানালেন নিজেই

জামায়াত এবং ইসলামী আন্দোলন সংসদের উভয় কক্ষে পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন চাইলেও অন্যরা শুধু উচ্চকক্ষে পিআর চায়। এ দলগুলো গণভোট নয়, ঐকমত্যের ভিত্তিতে সনদ বাস্তবায়ন চায়।
সাত দলের বৈঠক সূত্র জানিয়েছে, মতপার্থক্য থাকলেও সনদের আইনি ভিত্তি, সনদের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে সবাই একমত।

সাত দলের বৈঠকে বলা হয়, আগামী ফেব্রুয়ারিতে রমজানের আগে নির্বাচনে আপত্তি নেই তাদের। তবে বিএনপি তাদের ‘নির্বাচনবিরোধী’ তকমা দিতে চাইছে। এ অবস্থায় ভোটে হারার ভয়ে অন্য দলগুলো ভীত– এ বার্তা যেন জনগণের কাছে না যায়, সে জন্য দলগুলো প্রকাশ্যে নির্বাচনের বিরোধিতা করবে না বলে বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়। তারা বরং সনদের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে সোচ্চার থাকবে। প্রয়োজনে একসঙ্গে আন্দোলন করবে।

জামায়াতের ডা. তাহের সমকালকে বলেছেন, যারা ভোটের আগে সংস্কার চায় না, তারাই মূলত নির্বাচন ভণ্ডুল করতে চায়। যারা সংস্কার চায়, তারাই আসলে নির্বাচনের পক্ষে।

খালেদা জিয়ার দিকে তাকিয়ে জামায়াত
রাজনৈতিক সূত্র সমকালকে জানিয়েছে, সালাহউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে বৈঠকের পর জামায়াত বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গেও কথা বলেছে। তারা এখন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাইছে।

জামায়াতের সঙ্গে বৈঠক বা সাতটি দলের বৈঠক নিয়ে বিএনপির কোনো নেতা মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে দলটির সূত্র নিশ্চিত করেছে, বিএনপি চেয়ারপারসনের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় চেয়েছে জামায়াত।
গত এপ্রিলে লন্ডনে খালেদা জিয়া এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান ও ডা. তাহের। এর পর দল দুটির পরস্পরকে আক্রমণ করে বক্তব্য দেওয়া কমেছিল। গত কিছু দিনে তা আবার বেড়েছে। জামায়াত সূত্র সমকালকে জানিয়েছে, খালেদা জিয়াকে সামগ্রিক পরিস্থিতি জানাতে চায় তারা।

আপনার মতামত লিখুনঃ

আরও পড়ুন

সর্বশেষ সংবাদ